ঢাকা ০৪:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিমাসে লোকসান গুনছে ৩৬ কোটি টাকা ব্যবসা সম্প্রসারণে নেই ‘কৌশল’ ৯৯৯ এর সুত্র ধরে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের লাশ উদ্ধার বিদেশে বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সহায়তা দিতে ব্যর্থতায় হাইকোর্টে রিট দুবাই থেকে আসা চীনা ২ যাত্রীর কাছ থেকে ২৪ কোটি টাকার স্বর্ন উদ্ধার স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ৪৬ অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়া বন্ধ ও বৈধপথে রেমিটেন্স পাঠানোর আহবান প্রবাসী মন্ত্রীর মালয়েশিয়াগামীদের মেডিকেল পরীক্ষা ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু আকামার মেয়াদ শেষ হলেও সৌদি যাওয়ার ক্লিয়ারেন্স পাবেন প্রবাসীরা: প্রবাসী কল্যান মন্ত্রী সোনালী, জনতা ও রুপালী ব্যাংকের এমডির চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বিমানের রিয়াদ ফ্লাইট স্থগিত

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিমাসে লোকসান গুনছে ৩৬ কোটি টাকা ব্যবসা সম্প্রসারণে নেই ‘কৌশল’

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪৮:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

 

বিশেষ প্রতিবেদক:

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণে দৃশ্যমান কোন ‘কৌশল’ নেই। এরফলে প্রতিমাসে লোকসান গুনছে আনুমানিক ৩৬ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণ ও বিনিয়োগের প্রায় ৮৮ শতাংশই খেলাপি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।
বিপুল অঙ্কের আমানত, ঋণ ও বিনিয়োগ নিয়ে আর্থিক সঙ্কটে থাকা প্রতিষ্ঠানটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ আদায় করা, আয় বাড়ানো এবং আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সেটির দিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে বিদ্যমান জনবলকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে নতুন করে উচ্চ বেতনে ব্যাংকটিতে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছ্ েএতে ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আওয়ামী আমলে ব্যাংকে বিতর্কিত ও দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম ও কয়েকজন অলিগার্কের মাধ্যমে জনগণের আমানত লুট হওয়া সমস্যাগ্রস্ত ৫টি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ২৮ হাজার ১১০ কোটি টাকা। অন্য দিকে ব্যাংকটির মোট ঋণ ও বিনিয়োগ ১ লাখ ৯৭ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৭৩ হাজার ২১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণ ও বিনিয়োগের প্রায় ৮৮ শতাংশই খেলাপি। আগস্টের শেষ নাগাদ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত এই পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকটিতে বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মিলিয়ে জনবল রয়েছে ১৫ হাজার ১৩৫ জন। এর মধ্যে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩ হাজার ৯৪৮ জন, এক্সিম ব্যাংকের ৩ হাজার ১৩৮ জন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৪ হাজার ৯৯ জন, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ২৪২ জন এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের ১ হাজার ৭০৮ জন কর্মরত রয়েছে। এত বিপুল জনবল থাকার পরও নতুন নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক উচ্চ হার। পাঁচটি ব্যাংকের পৃথক হিসাবেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। আগস্টের শেষ নাগাদ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক ০৪ শতাংশ, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তিনটি ব্যাংকের ঋণের প্রায় পুরোটাই খেলাপি হয়ে পড়েছে। অন্য দু’টি ব্যাংকের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ফলে একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত নতুন ব্যাংকটির জন্য ঋণ আদায় বাড়ানো এবং সম্পদের মান উন্নত করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে উঠেছে।
ব্যাংক সংশ্লিস্টদের অভিযোগ, বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে এখনো জোরালো ও দৃশ্যমান উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে আগের ব্যবস্থাপনার সময় বিতরণ করা ঋণের অর্থ উদ্ধার, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে আরো তৎপরতা প্রয়োজন। তাদের মতে, ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ব্যাংকটির আয় বৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
১০ লাখ টাকা বেতনে অতিরিক্ত এমডি নিয়োগ
ব্যাংকটির ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে উচ্চ বেতনে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের কারণে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজে মাসে প্রায় ১৭ লাখ টাকা বেতন নেয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আহমেদ জাফরুল হাসানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার মাসিক বেতন প্রায় ১০ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সূত্রগুলোর অভিযোগ, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তার আগের কর্মস্থল ছিল কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, বাংলাদেশ। সেখানে তিনি ইউনিট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার পদমর্যাদা, দায়িত্ব ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনায় অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতো উচ্চপর্যায়ের পদে নিয়োগ দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়োগের শর্ত, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নতুন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন কাঠামো এবং নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও একাডেমিক ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কিছু কর্মকর্তা। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মাসিক বেতন ১০ লাখ টাকা হলে শুধু বেতন বাবদ বছরে ব্যয় হবে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর সাথে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হলে ব্যয়ের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। ব্যাংকটি যখন প্রতি মাসে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা লোকসান গুনছে, তখন নতুন উচ্চ বেতনের পদ সৃষ্টির আগে এর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য সুফল মূল্যায়ন করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।
পরিচালনা পর্ষদে ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা করা। এ জন্য সরকার ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগানের ব্যবস্থা করেছে বলে দেয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা ও তদারকির জন্য একটি পরিচালনা পর্ষদও গঠন করা হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি তিনজন আমলা এবং বেসরকারি পেশাজীবীদের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরকারি আমলাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এতে পর্ষদের ভারসাম্য ক্ষুণœ হয়েছে এবং চেয়ারম্যানের একক কর্তৃত্ব বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ বিপুল এবং সরকারি মূলধনের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তখন নিয়োগ, ব্যয় ও ঋণ আদায়ের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান কাঠামো ও ক্ষমতার বণ্টন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং পর্ষদের আনুষ্ঠানিক নথি যাচাই করা জরুরী।
একীভূতকরণের পরও জনবল সমন্বয় নেই
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পাঁচ শতাধিক শাখা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর বেশির ভাগই শহরাঞ্চলে অবস্থিত। একই শহরে পাঁচটি ব্যাংকের একাধিক শাখা থাকায় একীভূতকরণের পর শাখা ও জনবল সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার পরিবর্তে নতুন নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন