শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:৫৪ অপরাহ্ন

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর বিলাসী জীবন

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের স্ত্রীর বিলাসী জীবন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। ক্ষমতায় থাকাকালীন নাজিবপত্নী রোসমাহ মানসুর ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য তার কর্মীদের বেতন দিতেন ২৯ হাজার ডলার।

এ অর্থের জোগান আসত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের এক প্রতিবেদনেও তার অলঙ্কারের দাম নিয়ে আলোচনা করা হয়।

এ দিকে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের স্ত্রী রোসমাহকে ৬৫ লাখ রিঙ্গিত ঘুষ দেয়া হয়েছিল বলে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন রিজাল মানসুর নামের সাবেক এক সহযোগী। আদালতে স্বীকারোক্তির পর আবারও আলোচনায় নাজিবপত্নী।

আদালতে মানসুর বলেছেন, ‘নাজিব রাজাক যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন জিপাক হোল্ডিং এসডিএন বিএইচডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবাং সামুদ্দিনের পক্ষ থেকে দুই দফায় অর্থ পৌঁছে দিয়েছেন রোসমাহর কাছে। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারের কাছ থেকে ১২৫ কোটি রিঙ্গিতের একটি সোলার হাইব্রিড প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নেয়া। এছাড়া ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের দিকে পুত্রজয়ায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন সেরি পারদানায় রোসমাহকে দেয়া হয়েছে ৫০ লাখ রিঙ্গিত।’

তিনি আদালতে আরও বলেন, ‘ওই অর্থ রোসমাহর কাছে পৌঁছে দেয়ার সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার গাড়ির চালক ও একজন বন্ধু আহমেদ ফারিক জয়নুল আবিদিন।’

বুধবার মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম মালয় মেইলে এসব তথ্য প্রকাশিত হলে আবারও আলোচনায় নাজিবপত্নী রোশমাহ।

মানসুর বলেন, ‘আমরা সেরি পারদানা কমপ্লেক্সে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল সঙ্গে থাকা লাগেজ ব্যাগ দুটি দু’জন বাটলারের মাধ্যমে রোশমাহর কাছে পৌঁছে দেয়া। এই দুটি ব্যাগে ছিল ৫০ লাখ রিঙ্গিত।’

‘রোশমাহ বাসার ভেতরে আমার গাড়িতে রাখা ছিল ওই অর্থ। আমি বাসার ভেতরে প্রবেশ করি। গাড়িতে শুধু তখন অবস্থান করছিলেন ফারিক ও আমার গাড়ির চালক। এরপর ওই দুটি লাগেজ বুঝে পাওয়ার পর আমি রোশমাহর সঙ্গে সাক্ষাত করি। এ সময় তিনি জানতে চান- এতে কত আছে? জবাবে আমি তাকে বলি ‘পাঁচ’ অর্থাৎ ৫০ লাখ রিঙ্গিত বা ৫ মিলিয়ন রিঙ্গিত। এ অবস্থায় ওই দুটি লাগেজ খুলে দেখলেন না তিনি। বাটলারদের নির্দেশ দিলেন এগুলো তার রুমে রেখে আসতে। এরপরই আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসি।’

ফের আলোচনায় মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর বিলাসী জীবন

তিনি আরও বলেন, ‘একই দিন সাইদি এবং রায়ান রাদজউইল আবদুল্লাহর বাসভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তিনি এত সুন্দরভাবে সব ঠিকঠাক মতো কাজ করে দিতে পেরেছেন বলে তাকে উপহার হিসেবে ৫ লাখ রিঙ্গিত তুলে দেন। ২০১৭ সালের এক সাক্ষাতে সাইদি তাকে আরও জানিয়েছেন যে, রোশমাহকে আরও ১৫ লাখ রিঙ্গিত দিয়েছেন আবদুল্লাহ। তিনি যখন জালান লাঙ্গাক দুটায় ব্যক্তিগত বাড়িতে রোশমাহর সঙ্গে সাক্ষাত করেন, তখন এই অর্থ তার কাছে তুলে দিয়েছিলেন।’

এর আগে একই আদালতে সাইদি বলেছিলেন, ‘তিনি এবং রায়ান দুটি ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিলেন রোশমাহর বাসায়। তাতে ছিল ১৫ লাখ রিঙ্গিত। এটা ২০১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। এই মামলায় সাইদির কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে ১৮ কোটি ৭৫ লাখ রিঙ্গিত হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে রোশমাহর বিরুদ্ধে। বিনিময়ে তিনি ১২৫ কোটি রিঙ্গিতের সোলার এনার্জি প্রজেক্টের কাজ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাইয়ে দিতে সহায়তার কথা বলেন।’

এ দিকে ২০১৮ সালে নাজিব রাজাকের বাড়ি থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়। জব্দ করা সম্পদের মধ্যে ১২ হাজার পিস গয়না, বিভিন্ন ব্যাগে প্রায় তিন কোটি ডলারের সমমূল্যের ২৬টি দেশের মুদ্রা, ৪২৩টি ঘড়ি এবং ২৩৪ জোড়া সানগ্লাস। এ ছাড়া নামিদামি নকশাকারদের তৈরি দামি ও শৌখিন জিনিস রয়েছে। ২০১৮ সালের মে মাসে কুয়ালালামপুরে নাজিবের বিলাসবহুল ভবন এবং মূল বাড়িসহ তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়টি স্থানে অভিযান চালিয়ে এসব মূল্যবান জিনিস জব্দ করার পর সাবেক ফার্স্ট লেডি রোশমাহ মানসুরের বিলাসী জীবনযাপনের বিষয়টি সামনে আসে।

 

অন্যদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের একেবারেই সাধারণ জীবনযাপন নিয়ে আলোচনায় মুখর মালয়ানরা। তখন এ আলোচনার প্রধান আলোচ্য ছিল, মাহাথিরের ৪ ডলার দামের অতিসাধারণ স্যান্ডেল। নাজিব পরিবারের ওই অ্যাপার্টমেন্টগুলো থেকে ব্যয়বহুল হারমেস ওয়ানসহ কয়েকশ হাতব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, তারা সে সময় যেসব জিনিস উদ্ধার করেছে তার মধ্যে রয়েছে হেরমেস বিরকিন ব্র্যান্ডের কমলা রঙের বহু ব্যাগ। বলা হচ্ছে, এসব ব্যাগের মালিক নাজিব রাজাকের স্ত্রী এবং সাবেক ফার্স্ট লেডি রোশমাহ মানুসরের।

একটি হেরমেস বিরকিন ব্যাগের দাম হতে পারে আট হাজার ডলার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ ডলার। মালয়েশিয়ার অনেক নাগরিক মনে করেন, যেসব বিলাসবহুল সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে সেগুলো নাজিব রাজাকের বিলাসী জীবন এবং কথিত দুর্নীতির অভিযোগের প্রতীক, যার জেরে ক্ষমতা থেকে তার পতন ঘটেছে।

ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে নাজিব রাজাকের স্ত্রী রোশমাহর কেনাকাটা করার শখ এবং ব্র্যান্ডের জিনিসপত্রের প্রতি তার ভালোবাসার কারণে তিনি প্রচুর সমালোচনাও কুড়িয়েছেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এসব নিয়ে প্রচুর কথাবার্তাও হয়েছে। হ্যাশট্যাগ দিয়ে টুইটারে ট্রেন্ডিং করেছে বিরকিন ব্যাগ। একজন টুইটার ব্যবহারকারী লিখেছিলেন, ‘ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের ১০০টির মতো বিরকিন ব্যাগ ছিল। সে কারণে তিনি সুপরিচিত ছিলেন।’
তখন বাণিজ্যিক অপরাধ তদন্ত বিভাগের পুলিশপ্রধান অমর সিংহ বলেছিলেন, ‘এটিই সম্ভবত মালয়েশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জব্দ তালিকা। জব্দ জিনিসপত্রের মূল্য সাড়ে ২২ কোটি ডলার থেকে ২৭ কোটি ৩০ লাখের মধ্যে হবে’।

নাজিব রাজাক ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ তহবিল ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদের (ওয়ানএমডিবি) অর্থ আত্মসাৎ করে নাজিব নিজ ব্যাংক হিসাবে জমা করেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছিল।

এরপর বলা হয়েছিল, নাজিব রাজাককে ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে সহায়তা করতে ৬৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার দিয়েছিল সৌদি আরব। তবে নাজিব ও তার পত্নী বরাবরই দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। সুত্র : জাগোনিউজ

সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুন

© All rights reserved © Zahir-01743535311