বেরিয়ে এলো সিদ্ধিরগঞ্জে তিন হত্যার কারণ

4

স্টাফ রিপোর্টার :

রুমের পুরো মেঝেতে রক্ত আর রক্ত। তিনটি নিথর দেহ পড়ে আছে। ভালোবাসার স্ত্রী আর আদরের দুই সন্তানের লাশ। বাচ্চাদের খেলনার পাশে ঘাতকের ব্যবহৃত একটি চাকু পড়ে আছে। পাশেই আহতাবস্থায় বসে কাঁদছিল বড় ভায়রা আব্বাসের একমাত্র প্রতিবন্ধী মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (১৫)। কর্মস্থল থেকে ফিরে বাসায় ঢুকে এমন দৃশ্য দেখে নির্বাক আব্দুস সোবহান সুমন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে স্ত্রী-সন্তানদের লাশের পাশে বসে পড়েন তিনি। পরক্ষণে সুমনের চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে বীভৎস এ ঘটনা দেখে পুলিশকে খবর দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে সিদ্ধিরগঞ্জের সিআই খোলা এলাকায় জনৈক আনোয়ার হোসেনের ৬ তলা বাড়ির ষষ্ঠতলার একটি ফ্ল্যাটে এই তিনজনকে ধারালো চাকু দিয়ে গলা কেটে নৃশংস  ভাবে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন- সুমনের স্ত্রী নাজনীন আক্তার (২৭), তার মেয়ে নুসরাত জাহান নিঝু (৬) এবং খাদিজা আক্তার (২)। রক্তাক্ত আহত অবস্থায় নিহত নাজনীনের বড় বোনের একমাত্র প্রতিবন্ধী মেয়ে সুমাইয়া আক্তারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছোরা উদ্ধার করেছে। ছোরাটি ঘাতক নিয়ে এসেছিল, নাকি সেটি নিহত নাজনীনের বাসাতেই ছিল সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাড়ির মালিক আনোয়ার হোসেন, কেয়ারটেকার কবীর হোসেন এবং নিহত নাজনীনের বড় বোন ইয়াছমিন আক্তারকে আটক করেছে। তবে ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছে নিহত নাজনীনের বড় বোন ইয়াছমিনের স্বামী আব্বাসকে। গতকাল বিকালে আব্বাসকে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের একটি বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। আব্বাস পেশায় খানসামা (ওয়েটার)।  নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, পারিবারিক কলহের জের ধরে এই পরিবারেরই কেউ এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি নিহত নাজনীনের বড় বোনের স্বামী আব্বাস একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আব্বাসের প্রতিবন্ধী মেয়ে সুমাইয়া ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন সুমাইয়াও বিষয়টি পুলিশকে নিশ্চিত করেছে। সন্ধ্যায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পুলিশ সুপার প্রেস ব্রিফিং করে বলেন- আব্বাস হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে।
এদিকে গতকাল সকালে ঘটনাস্থল সিদ্ধিরগঞ্জের সিআইখোলা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে আনোয়ার হোসেনের বাড়ি ঘিরে শত শত উৎসুক মানুষের ভিড়। ওই বাড়ির আশেপাশের বাড়ির ছাদেও নারী-পুরুষদের ভিড়। সবার লক্ষ্যবস্তু আনোয়ার হোসেনের বাড়ি। খবর পেয়ে সিআইডি’র ক্রাইম সিনের সদস্যরা দুপুরে আলামত সংগ্রহ করার পর লাশ উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ দেড়শ’ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে। নিহত নাজনীনের স্বামী সুমন বলেন, তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় জোনাকী পেট্রোল পাম্পে কাজ করেন। বুধবার রাতে তার নাইট ডিউটি ছিল। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় তিনি বাসায় ফিরে দেখেন ফ্ল্যাটের দরজা খোলা, তবে ভেড়ানো। তিনি দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেই বড় একটি ধাক্কা খান। ফ্ল্যাটের ফ্লোরে স্ত্রী ও দুই মেয়ের নিথর দেহ পড়ে আছে। পাশেই বড় ভায়রা আব্বাসের প্রতিবন্ধী মেয়ে সুমাইয়া আহতাবস্থায় বসে কাঁদছিল। আর রক্তে পুরো ফ্লোর ভেসে গেছে। এ দৃশ্য দেখে তিনি চিৎকার করে উঠেন। তার চিৎকার শুনে আশেপাশের প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। ওই সময় তিনি কি করবেন বুঝতে না পেরে স্ত্রী-সন্তানদের লাশের পাশে বসে পড়েন। কোনোমতে আহত সুমাইয়াকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, তার বাবাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বাবা তাকেও মারার জন্য ছুরি দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। সুমাইয়ার বরাত দিয়ে সুমন আরো জানান, গতকাল সকাল ৮টার দিকে আব্বাস তার ফ্ল্যাটে আসে। ওই সময় বড় বোন ইয়াছমিনকে মারধর করা নিয়ে আব্বাসের সঙ্গে নাজনীনের বাদানুবাদ হয়। এক পর্যায়ে সুমন বলেন, তার বড় ভায়রা আব্বাসের সঙ্গে জেঠাস ইয়াছমিনের পারিবারিক কলহ চলছিল। গত মঙ্গলবারেও দু’জনের মধ্যে ঝগড়া হয়। ওই সময় আব্বাস তার জেঠাস ইয়াছমিনকে মারধর করে। এ খবর পেয়ে শ্যালক হাসান আব্বাসের বাসায় গিয়ে আব্বাসকে মারধর করে। পারিবারিক কলহের কারণে বুধবার রাতে মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে ইয়াছমিন আমাদের বাসায় চলে আসে। বড় বোন ইয়াছমিনকে মারধরের কারণে একবার নাজনীন দুলাভাই আব্বাসকে চড় দিয়েছিল বলে জানান সুমন। এদিকে নিহতের বড় বোন ইয়াছমিন বলেন, তিনি আদমজী ইপিজেডে সুপ্রিম নিটওয়্যার নামে একটি গার্মেন্টে কাজ করেন। স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের কারণে তিনি বুধবার রাতে মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে ছোট বোন নাজনীনের বাড়িতে চলে আসেন। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি কাজে চলে যান। পরে গার্মেন্টে কর্মরত অবস্থাতেই জানতে পারেন ছোট বোন নাজনীন খুন হয়েছেন। এ খবর পেয়ে তিনি নাজনীনের বাড়িতে ছুটে আসেন। তিনি আরো বলেন, তিনি নাজনীনের পাশের মহল্লা বাতানপাড়া এলাকায় স্বামী-সন্তানকে নিয়ে ভাড়া থাকেন। তার স্বামী মাদকাসক্ত। এ কারণে প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো। নিহত নাজনীনের শ্বশুর নিজাম উদ্দিন বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় তার ছেলে সুমন তাকে ফোন করে বলে, বাবা আমার সব শেষ। নিঝু-খাদিজাসহ তার মাকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ খবর পেয়ে আমরা সুমিলপাড়ার বাসা থেকে দ্রুত সিআইখোলা চলে আসি। তিনি বলেন, আমার জানামতে আমার ছেলের কোনো শত্রু নাই। তাহলে কে এ ঘটনা ঘটালো। প্রেম করে নাজনীনকে বিয়ে করায় আমরা ওই বিয়ে মেনে নেইনি। তাই সুমন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সিআইখোলা এলাকায় ভাড়া থাকতো। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি কামরুল ফারুক বলেন, পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে পৌনে ৯টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনা ঘটেছে। কারণ সকাল সাড়ে ৭টার আগে ওই বাসায় নিহত নাজনীনের বড় বোন ইয়াছমিন ছিল। পুলিশ ঘটনার জন্য দায়ী আব্বাসকে সিদ্ধিরগঞ্জের পাওয়ার স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করেছে। ৩ জনকে হত্যা এবং নিজের সন্তানকে কুপিয়ে আহত করে সে ঘটনা আড়াল করতে সিদ্ধিরগঞ্জের পাওয়ার স্টেশনের ভেতরে একটি বিয়ে বাড়িতে খানসামার কাজ করছিল। যে ৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। কাজে গিয়ে ছটপট করছিল ঘাতক আব্বাস সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল এলাকায় রাজমণি ডেকোরেটরের মালিক মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আব্বাস গত ১০/১১ বছর ধরে বিভিন্ন সরদারের সঙ্গে খানসামার কাজ করে। পাশাপাশি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করতো। আজ (গতকাল) সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের ভেতরে ক্লাবে একটি বিয়ের বৌ-ভাতের অনুষ্ঠান ছিল। সকাল ৮টার দিকে আমি আব্বাসের মোবাইলে ফোন দেই। কিন্তু সে ফোন রিসিভ করেনি। আবার ফোন দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বেলা ১১টায় আমি সিদ্ধিরগঞ্জে পুরো ডেকোরেটরের মালামাল নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। এ সময় আব্বাস এসে আমার মোবাইল নিয়ে জুয়েল নামে একজনকে ফোন করে চলে যায়। এরপর আমরা বিয়ের অনুষ্ঠানে খাবারের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই। এরমধ্যে বেলা পৌনে ১টার দিকে সে কাজে আসার পর কেমন যেন ছটপট করছিল। খালি অযথা পায়চারী করে। এক পর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সে খাবারের টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ে। এবং তাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ।