প্রবাসী কল্যাণ তহবিলে নির্মিতব্য আবাসন প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা

30

জাহাঙ্গীর খান বাবু:প্রবাসী কল্যাণ তহবিলের টাকা লুটপাটের এক অনন্য উদাহরণ হচ্ছে সরকারের গৃহীত প্রবাসীদের জন্য গুলশান পুলিশ থানার অধীন আবাসন প্রকল্প। এখান থেকেই দেখা যায় কীভাবে গত ১৩ বছর ধরে মূল্যবান ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে থাকতে পারে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবাসন সুবিধা দিতে ২০০১ সালে গুলশান থানার ভাটারা মৌজায় ২৮ কোটি ২৮ লাখ টাকায় কেনা হয় ১৬৭ দশমিক ২৮ কাঠা জমি। বারিধারার ডিওএইচএস প্রধান ফটকের পূর্ব পাশে এ জমি অবস্থিত।

এ টাকার প্রধান অংশ নেয়া হয়েছে বিদেশে যাওয়ার পূর্বে কল্যাণ তহবিলের জন্য প্রবাসী শ্রমিকদের দেয়া টাকা থেকে। অন্য আরও কয়েকটি উৎস থেকেও অর্থ নেয়া হয়েছে। আর এ তহবিল তদারকরি দায়িত্বে ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি নির্বাহী বোর্ড। জমি ক্রয়ের পর বিভিন্ন সময় বোর্ডের  বৈঠকে বহু সিদ্ধান্ত  নেয়া হলেও তা কখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয় একটি বিশেষায়িত কিডনি হাসপাতাল তৈরি করবে। কিন্তু একই বছরের মে মাসে আইটি প্রশিণ ইন্সটিটিউট গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে সিদ্ধান্তটি বাতিল করা হয়।

এরপর ২০০৩ সালের মার্চ মাসে বোর্ড আবার আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে একমত হয়। পরিকল্পনা অনুসারে পাঁচশ অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করে ৫শ প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ল্েয বোর্ড বোরাক রিয়েল এসেট এবং ইস্টার্ন হাউজিংয়ের সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ১৪৫ কোটি টাকার চুক্তি স্বার করে।

প্রকল্প অনুসারে ছয়টি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন তৈরি করা হবে। ৬টির মধ্যে ৫টি হবে ১৫ তলা ভবন এবং প্রতিটিতে ২টি করে বেসমেন্ট থাকবে। বাকি ভবনগুলো হবে নয়তলা। ১৮০০, ১৫০০, ১২০০ এবং ১০০০ বর্গফুটের চার শ্রেণির অ্যাপার্টমেন্ট  তৈরি করা হবে।

২০০৪ সালের এপ্রিলে কাজের নির্দেশনামা প্রদান করা হয়। চুক্তি স্বারের ৩০ দিনের মধ্যে নির্মাণ কাজ শুরু এবং ৩ বছরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার কথা ছিল।

কিন্তু সময়মত নকশা প্রদান না করায় ঠিকাদার কোম্পানি কাজ শুরুই করতে পারেনি। রাজউকের দেয়া প্রাথমিক নকশার ভিত্তিতে ২০০৪ সালের অক্টোবরে কাজ শুরু হয়। ২০০৭ সালের জুনে তা শেষ হওয়ার কথা। প্রবাসী কল্যাণ ও  বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বোর্ড ব্যাংক গ্যারান্টির জন্য দুই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে ২৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা প্রদান করেছে। পাশাপাশি বোর্ড ৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকার একটি বিল পরিশোধ করে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৩ সালে প্রকল্পটি বাতিল করার ফলে বাস্তবিক অর্থে এ টাকার অপচয় হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৩ সালে বোর্ড আবাসন প্রকল্পটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফ্যাটের আবেদনকারীদেরও টাকা তুলে নিতে বলা হয়। এক হাজার ৩৫০ জন আবেদনকারীর মধ্যে ৬০০ জন তাদের টাকা তুলে নিয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, যদি সময়মত সিদ্ধান্ত নেয়া যেত তাহলে অনেক টাকা আয় হত এবং অপচয় হওয়া টাকা প্রবাসীদের কল্যাণে কাজে লাগানো যেত।

নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণে বোর্ড এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বন্দের সূত্রপাত হয়। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে দুই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধির জন্য বোর্ডের কাছে আবেদন করে। বোর্ড এতে সম্মত না হওয়াতে নির্মাণকাজ ব্যাহৃত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়।

প্রবাসী কল্যাণ এবং  বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে ২০০৬ সালে আবাসন প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়। চুক্তি অনুসারে বোর্ড এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান উভয়েই বিরোধ মীমাংসার জন্য সমঝোতা করার কথা। মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রণালয় বিরোধ নিরসনে সমঝোতা উদ্যোগ নিলেও এখনও তা কার্যকর হয়নি।

বোরাক রিয়েল এসেটেটের পরিচালক গাজী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সমঝোতা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যদি সমঝোতায় পৌঁছানো যায় তাহলে বিরোধ মীমাংসা হতে পারে। ইস্টার্ন হাউজিংয়ের নির্বাহী পরিচালক এসএম সোলায়মান প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে এ প্রতিবেদক দেখতে পান,দুইটি বেসমেন্টসহ ৫টি ভবনের মাত্র একটির তিনতলা ইস্টার্ন হাউজিং এবং আরেকটির দুটি বেসমেন্টসহ ভবন বোরাক সম্পন্ন করেছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার শওকত হোসাইন জানিয়েছেন, ৫০০ প্রবাসীর জন্য ৫০০ অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না।

প্রবাসী কল্যাণ তহবিলের অর্থের অপচয়ের কথা অস্বীকার করে সচিব বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য আমরা উৎপাদনমুখী প্রকল্পের চিন্তা করছি।

তিনি আরও জানান, প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে জমির উপযুক্ত ব্যবহারের উপায় খুঁজে বের করার জন্য সংসদ সদস্য ইস্রাফিল আলমের নেতৃত্বে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধী মীমাংসার জন্য প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হযরত আলীর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। হযরত আলী বলেন, ঠিকাদারদের সঙ্গে সমঝোতার জন্য বেশ কয়েকটি  বৈঠক হয়েছে।

প্রকল্পটি গ্রহণ করার পরপরই বোর্ড প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে অ্যাপার্টমেন্ট প্রদানের জন্য আবেদন আহ্বান করে। প্রায় ১ হাজার ৩৫০ প্রবাসী আবেদন জমা দেন। প্রাথমিকভাবে আবেদনের সঙ্গে ১৮০০ বর্গফুটের জন্য ১৮০০ ডলার (ইউএস), ১৫০০ বর্গফুটের জন্য ১৫০০ ডলার, ১২০০ বর্গফুটের জন্য ১২০০ ডলার এবং ১ হাজার বর্গফুটের জন্য ১০০০ ডলার প্রদান করতে হয়েছে।

অন্যান্য প্রবাসীদের মতো সাবিরুল ইসলাম ২০০৬ সালে ১৫০০ বর্গফুটের ফ্যাটের জন্য ১৫০০ ডলার জমা দিয়ে আবেদন করেন। আট বছর পর গত মাসে তিনি জমা দেওয়া টাকা কল্যাণ তহবিল থেকে তুলে নেন। সাবিরুল ইসলাম বলেন, আমি হতাশ। যদি ব্যাংকে টাকা জমা রাখতাম তাহলে দ্বিগুণ হতো।

তিনি বলেন,এছাড়া আমি আট বছর ধরে টানা যোগাযোগ করেছি এবং প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করেছি।