নিখোঁজ এক বিরোধী রাজনীতিকের খোঁজে

0

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক : রাস্তাজুড়ে এক ভীতিকর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এখান থেকেই সালাহউদ্দিন আহমেদকে এক মাস আগে অপহরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তিনি বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা। সেদিন কয়েকজনকে বাড়ির ফটক খুলে দিয়েছিল এক কেয়ারটেকার। সে সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, ওই লোকগুলো ছিল পুলিশের গোয়েন্দা। ওই কেয়ারটেকারকে এরপর আর কখনই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে দিয়েছিল যে পরিচারিকা, তাকেও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাড়ির মালিককেও পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি একটি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর। পাশের ভবনের দারোয়ান মোজাম্মেল জানায়, অবশ্যই কিছু একটা হয়েছে। তবে প্রত্যেকে চুপ থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করছে। ভবনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক ব্যক্তি। সালাহউদ্দিন আহমেদের ব্যাপারে তিনি কোন প্রশ্ন না করার অনুরোধ জানান সাংবাদিকদের। তিনি জানান, এর ফলে প্রতিবেশীরাও বিপদের মুখে রয়েছেন। ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, সবাই ভীত। নিজের নাম প্রকাশ না করে তিনি জানান, এমনকি আপনিও এ মুহূর্তে নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল মুখোমুখি অবস্থান থেকে সরে এসেছে। জানুয়ারি থেকে দেশটি প্রায় পঙ্গু হয়ে ছিল। তখন বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হরতাল ও অবরোধের ডাক দেন। তিনি আশা করেছিলেন, এর ফলে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য হবেন। সেই থেকে শতাধিক মানুষ পেট্রলবোমায় নিহত হয়েছে। বিএনপির ডজন ডজন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। রোববার উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে আসে বলে মনে হয়। সেদিনই বিএনপি প্রধান বেগম জিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এর আগে তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এরপর আদালত তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ না দিয়ে জামিন মঞ্জুর করেন। এপ্রিলের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নিজ দলের প্রার্থীদের নির্দেশনা দিয়েছেন খালেদা। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, আন্দোলন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তবে সংকট  থেকে সরে যাওয়াটা এতটা সহজ-সরল হবে না। এর একটি কারণ, ১০ই মার্চ সালাহউদ্দিন আহমেদের গুম হয়ে যাওয়া। বিএনপি নেতারা ও সালাহউদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা নিশ্চিত যে, সরকারি সংস্থাই সালাহউদ্দিনকে অপহরণ করেছে। বহু বছর ধরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নির্যাতন, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাসমূহ নথিভুক্ত করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মতো অভিজাত সন্ত্রাসবাদবিরোধী স্কোয়াডের হাতে হওয়া ঘটনাসমূহও। এ স্কোয়াড যুক্তরাষ্ট্র থেকে অভ্যন্তরীণ  শাস্তিমূলক আচরণবিধির উপর প্রশিক্ষণ পায়। সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের ঘটনা অনেকের জন্যই উদ্বিগ্নের কারণ বলে জানিয়েছেন ঢাকাভিত্তিক দ্য ডেইলি স্টারের সমপাদক মাহফুজ আনাম। সালাহউদ্দিন দলের মুখপাত্র হিসেবে বেশ উঁচ্চস্তরের ভূমিকা পালন করতেন। মাহফুজ আনাম বলেন, বিষয়টা এরকম যে, সালাহউদ্দিন নিখোঁজ হয়ে গেলেন। কিন্তু কেউই দায়িত্ব নিচ্ছে না। আমার কাছে  এটি অত্যন্ত ভয়ানক একটি অবস্থা। যে কাউকেই রাতের অন্ধকারে তুলে নেয়া হতে পারে। কিন্তু সরকার এরপর বলবে, আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিন আহমেদকে যেখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছে, সেখানে উপস্থিত ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে কেয়ারটেকার আখতার আলিসহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শীদের কোন খোঁজ পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি। অনেকে পরসপরবিরোধী তথ্য দিয়েছেন। সে রাতে দুই ব্যক্তি দেখেছিলেন পুরো দৃশ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, সে রাতে তারা সালাহউদ্দিনের বাড়ির সামনে তিন থেকে চারটি গাড়ি দেখেছেন। এদের একটি র‌্যাবের ছিল। সালাহউদ্দিন আহমেদের গাড়িচালকের স্ত্রী রেবেকা সুলতানা বলেন, তার স্বামীকে সাদা পোশাকে সশস্ত্র কয়েক ব্যক্তি আটক করে নিয়ে যায়। সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম হয়ে যাবার দুই দিন আগের ঘটনা এটি। এরপর কাছের একটি পুলিশ স্টেশনে তাকে আটকে রাখা হয়। এখনও ওই গাড়িচালক কারাগারেই রয়েছেন। বৃহসপতিবার শেষ হওয়া আদালতের একটি শুনানিতে সরকারি আইনজীবী জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রীয় কোন বাহিনী আটক করেনি। তাকে খোঁজার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পুলিশ ইঙ্গিত দিয়েছে, সালাহউদ্দিন ২০টি মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে নিজেই লুকিয়ে আছেন। কিংবা নিজ দলের প্রতি মানুষের সহানুভূতি সৃষ্টি করতে তিনি নিজ থেকেই লুকিয়ে আছেন। ঢাকার গোয়েন্দা ও অপরাধ-গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, আমরা নিশ্চিত নই, তাকে কেউ ধরে নিয়ে গিয়েছে কিনা। তাকে নিয়ে যাবার সময় কেউই কোন আওয়াজ শোনেনি। কেউ জানতোই না, সালাহউদ্দিন সেখানে থাকতো। মনিরুল ইসলাম জানান, যখন পুলিশ কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে তথ্যের জন্য গিয়েছিল, তখন তারা ‘কেবল অস্বীকারই করেছিল’। তিনি জানান, পেট্রলবোমার ভয়েই হয়তো তারা কেউ মুখ খুলছে না। তার ইঙ্গিত, বিরোধী দলই হয়তো প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয় দেখাচ্ছে। সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ একজন সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, তিনি অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর তিনি পরিষ্কার হয়ে গেছেন যে, সালাহউদ্দিনকে নিরাপত্তা বাহিনী আটক করেছে। বৃহসপতিবার আদালতের শুনানিতে সালাহউদ্দিনের পরিবারের আইনজীবী মওদুদ আহমেদ জানান, আমরা বলতে চাই তিনি জীবিত আছেন। তিনি অবশ্যই জীবিত আছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে সালাহউদ্দিনের নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। সে সময় পেট্রলবোমায় বহু সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছিল। এসব সম্ভবত বিরোধী নেতারাই নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিএনপির বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ বা গাড়ি ভাঙচুরের মামলা রয়েছে। ডেইলি স্টারের মতে, দুজন যুগ্ম মহাসচিব, একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ আরও অনেকে কারাগারে রয়েছেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে উপ-যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন সালাহউদ্দিন। তিনি ছিলেন দলের একজন যুগ্ম সমপাদকও। জানুয়ারিতে তিনি সপর্শকাতর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সে সময় মুখপাত্র হিসেবে বিএনপির হরতাল ও অবরোধ তিনিই আহ্বান করতেন। তার ঠিক আগের দুজন মুখপাত্র গ্রেপ্তার হয়ে গিয়েছিলেন। তখনই দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। এ সময় লুকিয়ে যান সালাহউদ্দিন। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে স্থানান্তর হতেন নিয়মিত। পরিবারের সঙ্গে খুব কমই দেখা হতো তার। এসব জানিয়েছেন তার স্ত্রী। তার ১৭ বছর বয়সী কন্যা ফারিবা জানায়, কয়েক মাস ধরে বাবাকে দেখেনি সে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে বিএনপির একজন সাংগঠনিক সমপাদক ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। গত বছর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পরের ১১টি ঘটনা নথিভুক্ত করে। সেগুলোতে দেখা যায়, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটকের পর সন্দেহজনক অবস্থায় বিরোধী নেতা বা কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। এগুলোর অনেকগুলোই ঘটেছে র‌্যাবের হাতে। এ সপ্তাহে সরকারি কৌঁসুলিরা র‌্যাবের সাবেক তিন ব্যাটালিয়ন কর্মকর্তা ও ২ ডজনেরও বেশি সদস্যর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। ২০১৪ সালের এপ্রিলে সাতজন মানুষকে চুক্তিভিত্তিক খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এলেন ব্যারি নিউ ইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো চিফ। সূত্র : মানবজমিন