দুবাইয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশী নারীরা

28

স্টাফ রিপোর্টার: দালালের মিথ্যা আস্বাসে দুবাইয়ে গিয়ে দেহ ব্যবসায় বাধ্য হচ্ছেন বাংলাদেশি নারী কর্মীরা। ভালো বেতনের চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাদের নামানো হচ্ছে দেহ ব্যবসায়। অনৈতিক এ কাজ করতে না চাইলে নারী কর্মীদের অমানসিক নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুবাই থেকে গত ২৭ জুন দেশে ফিরে এসেছেন ‘এস’ আদ্যরের এক নারী কর্মী। তিনি দুবাইয়ে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ওপর পাশবিক এই নির্যাতনের ঘটনা খুলে বলেন। তিনি নিজেও পাশবিকতার শিকার হয়েছেন। দুবাইয়ে এখনও নিখোঁজ রয়েছে তার ‘আর’ আদ্যরের এক খালাতো বোন।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, ‘এস’ আদ্যরের ওই নারী কর্মীর স্বামী কবির হোসেন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ট্র্যাভেল এজেন্সি মিনার এয়ার ট্র্যাভেলসের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় গত সোমবার মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি।
জানা যায়, রাজধানীর ফকিরাপুলে অবস্থিত মিনার এয়ার ট্র্যাভেলস এর মাধ্যমে ‘এস’ (৩১) ও ‘আর’ (২৬) আদ্যরের দুই খালাতো বোন গত ৭ ও ৯ জুন দুবাইয়ে যান।
‘এস’ আদ্যরের নারীর স্বামী ঝালকাঠি জেলার নলছিটি পৌরশহরের কবির হোসেন বলেন, ‘আমার স্ত্রী ও তার খালাতো বোনকে দুবাইয়ে পাঠাতে দুই কিস্তিতে মোট ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। আমাদের বলা হয় দুবাইয়ে গিয়ে তারা কিনারের কাজ করবেন। বেতন ৪৫ হাজার টাকা। গত ৯ জুন আমার স্ত্রীকে ও ৭ জুন তার খালাতো বোনকে দুবাইয়ে পাঠান হয়। আজ পর্যন্ত স্ত্রীর খালাতো বোনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। দুবাইয়ে যাওয়ার দুই দিন পর ১১ জুন আমার স্ত্রী মোবাইলে জানায়-বাংলাদেশি যে এজেন্সির মাধ্যমে তাদের পাঠান হয়েছে তারা দুবাইয়ের এক দালালের কাছে তাকে বিক্রি করে দিয়ে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করাচ্ছে।
কবির হোসেন আরও বলেন, এ অবস্থায় পল্টন থানার সহায়তা নিলে পুলিশ সংশ্লিষ্ট মিনার এয়ার ট্র্যাভেলসের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেনকে চাপ দেয় আমার স্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য। গত ২৭ জুন সকালে আমার স্ত্রী দেশে ফিরে আসে। তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করি। কয়েকদিন চিকিৎসার পরে তাকে ডাক্তার রিলিজ দিয়েছে।
ডাক্তারি ছাড়পত্রে রোগীকে (এস) ‘সেক্সুয়াল এ্যাসাল্ট’-এ শিকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ওই নারী (এস) বলেন, দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে একটি গাড়িতে করে আমিসহ ১২ জনকে বাংলাদেশি সাইফুল ইসলামের অফিসে নেয়া হয়। সাইফুলের অফিস থেকে পরে তিন-চারজন করে ভাগ করে বিভিন্ন অফিসে পাঠান হয়। আমাকেসহ ৪ জনকে নাইজেরিয়ান এক মহিলার কাছে ওই দেশের দশ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন সাইফুল। আমি সাইফুলকে বলি- ভাই আমাকে কিনার পেশায় আনা হয়েছে তা ঠিক আছে তো। তিনি বলেন, হ্যাঁ ঠিক আছে। আমাকেসহ ৪ জনকে নাইজেরিয়ান ওই মহিলার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে নেয়া হয় সেটি তিন তলার একটি বাড়ি। ঢুকেই দেখি মেয়েরা অর্ধ নেংটা পোশাক পরে আছে। বিষয়টা ভালো লাগে না। সন্দেহ হলো- আমাকে এ কোথায় আনা হয়েছে। সাইফুলের বউ খায়রুন আমাকে নাইজেরিয়ান ওই মহিলার কাছে সোপর্দ করল। আমাকে একটি রুমে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। দেখি পুরুষ লোক নেংটা বসে আছে। আমি যেতে চাইছিলাম না। কিন্তু পরে সাইফুলের বউ আমাকে জোর করে ঢুকিয়ে দিল।

‘এস’ আদ্যরের ভুক্তভোগী নারী আরও বলেন, ভাই একে একে ৮ জন পুরুষ আমাকে পাশবিক নির্যাতন করল। সেন্সলেস হয়ে পড়লাম। এভাবে ৮ দিন, কিভাবে যে কেটেছে ভাই বলতে পারব না। আমি এ সব করতে চাইনি। তখন তারা আমার ওপর অমানসিক নির্যাতন করেছে। বলেছে টাকা দিয়ে কিনে এনেছি। তোকে এ সব করতেই হবে। আমাকে ঠিক মতো ভাত পানিও দেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, সাইফুলের ওখানে তিন বউ। তিনজনই বাংলাদেশি। তারা এ সব খারাপ ব্যবসা করে। পল্টন থানা থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ওসি সাহেব আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু বলতে পারি নাই। শুধু বলেছি- আমাকে এখান থেকে দেশে নিয়ে যান। দেশে ফিরে সব বলব। কারণ সাইফুল আমাকে তার রুমে নিয়ে লাথি মেরে বলেছিল- যা করেছিস এ সব যদি বলিস তোকে মেরে পাহাড় থেকে ফেলে দেব। দেশে ফেরার সাধ মিটিয়ে দেব। তাই ভয়ে ওসি সাহেবকে আমার ওপর নির্যাতনের কথা বলিনি।
নির্যাতনের শিকার ‘এস’ এর দাবি দুবাইয়ে ওই বাড়িতে দেহ ব্যবসা করতে বাধ্য হয়েছে অনেকেই। এদের মধ্যে কুষ্টিয়ার সায়মা (ছদ্মনাম) কিছুদিন আগে দেশে ফিরেছে। ওর অবস্থাও খারাপ। এ ছাড়া ঢাকার মিরপুরের পাখিয়ারা ও কুমিল্লার রাজিয়াসহ আরও ৪-৫ জন আছে ওই বাড়িতে। তারাও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সাইফুল ইসলাম মিনার ট্র্যাভেলস এর স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেনের আত্মীয় বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী ‘এস’ এর স্বামী কবির হোসেন বলেন, আমার স্ত্রীকে দিয়ে দেহ ব্যবসা করানো হয়েছে। এমন অভিযোগে পল্টন থানায় মিনার এয়ার ট্র্যাভেলস-এর স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন ও দালাল দেলোয়ার হোসেন আনোয়ার, শহিদ হোসেন, মোতালেব হোসেন ও সাইদ হোসেনের নামে গতকাল (সোমবার) মামলা করতে গেলে পল্টন থানার ওসি মামলা না নিয়ে বলেছেন, তোমার স্ত্রীকে তো ফিরিয়ে এনেই দিয়েছি। আবার মামলা কেন।
কবির বলেন, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আকুতি জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বরাবর আবেদন করেছি। আবেদনে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর স্বার ও সুপারিশও রয়েছে। কবির দাবি করেন তিনি ঝালকাঠির নলছিটি পৌরসভার ৯নং ইউনিট যুবলীগের সভাপতি। তার বাড়ি ঝালকাঠিতে হলেও স্ত্রী (এস) কুষ্টিয়ায় বাপের বাড়িতে থাকত। আর তিনিও কিছুদিন ঝালকাঠিতে এবং কিছুদিন কুষ্টিয়ায় শ্বশুর বাড়িতে থাকতেন।
দুই এক দিনের মধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করবেন বলেও জানান কবির হোসেন।
এদিকে ‘এস’ ফিরে এলেও তার খালাতো বোন ‘আর’ কোথায় আছে জানে না তার পরিবারের কেউই।
এ বিষয়ে পল্টন থানার ওসি মোর্শেদ আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি রেগে গিয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ওই ব্যাটা বরিশাইল্যা বাটপার। বউ দেশে আনার জন্য হাতে পায়ে ধরেছিল। উপকার করছি তো এখন ইতরের বাচ্চা আবোল তাবোল বলছে।’
মামলা করতে গেলেও মামলা নেওয়া হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলা করতে আসলে মামলা নেব না কেন। আর তার বউরে যদি টর্চার করে থাকে তাহলে তাকে (কবির হোসেন) ফোন করল কেমনে। আমি মামলা নেই নাই তাই না? ব্যাটারে থানায় আসতে বলেন। ব্যাটা ইতরের বাচ্চা।
এসআই ওবায়েদের উপস্থিতিতে তো একটি অঙ্গিকারনামায় সই করেছেন অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক আনোয়ার হোসেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওসি বলেন, কিসের অঙ্গীকারনামা। সেখানে কি আমাদের কারো সই আছে? ও (কবির) আমার পা ধরে কান্নাকাটি করে বলেছিল দুবাইয়ে তার বউকে আটকে রাখা হয়েছে, দেশে আনার ব্যবস্থা করে দেন। আমি সাব ইন্সপেক্টর ওবায়েদকে দিয়ে একটা মীমাংসা করে দিয়েছি।

এ ব্যাপারে মিনার এয়ার ট্র্যাভেলস এর স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ সব অভিযোগ সঠিক নয়। এ ছাড়া তারা যার মাধ্যমে গেছে তাকে কেন বলছে না। আমারে কেন হ্যারেজমেন্ট করছে।
যার মাধ্যমে গেছে তারা তো আপনারই লোক, আপনার অফিসের মাধ্যমেই তো দুবাই গেছেন তারা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, না আমার লোক কেন হবে।
তাহলে কি তারা দালাল? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দালাল বলছেন কেন- আপনি যে অফিসে চাকরি করেন সেখানকার হয়ে যদি কাজ করেন তাহলে কি আপনাকে দালাল বলা যাবে? পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি। তাহলে কি তারা আপনারই লোক? প্রশ্নে এবার চুপ করে থাকেন তিনি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, কবিরের ২-৩ জন স্ত্রী। সে আসলে মহিলাদের নিয়ে মানুষকে হ্যারেজমেন্ট করাই কাজ। ওই মহিলা যদি নির্যাতিত হতেন তাহলে তাকে দেশে আনা সম্ভব হতো না।
তাহলে কি ওই নারী নির্যাতনের শিকার নন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি মাধ্যমে গেছে। কিভাবে নির্যাতনের শিকার হবে। আসলে উনি নির্যাতিত হননি। সব সাজানো নাটক।