বিদেশগামী কর্মীদের টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে দেয়া প্রশিক্ষন মান নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদেশগামী নারী কর্মীদের সারাদেশের সরকারী টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে দেয়া প্রশিক্ষনের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশিক্ষনের মান খারাপ হওয়ার কারণে অধিকাংশ মহিলা কমীই বিদেশে যাওয়ার পর বিপদের মধ্যে পড়ছেন। ভাষা না জানার কারণে নিয়োগকর্তার হাতে তাদেরকে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। যার ফলে অনেক মহিলাই নির্যাতন সহৃ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসছেন।

অভিযোগ রয়েছে, টেকনিক্যাল সেন্টারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে দালালদের অর্থের যোগসাশজ থাকার কারণে অনেক সময় নারী কর্মীরা প্রশিক্ষণ নিলেও বাস্তবে কিছুই শিখছেন না। আবার অনেকে ট্রেনিং না নিয়েই সার্টিফিকেট নিয়ে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন।

সম্প্রতি বিদেশগামী নারী কর্মীদের বিদেশ গমনে জনশক্তি কর্মসংস্থাণ ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো কঠোর অবস্থান গ্রহন করে। এতে প্রতিটি নারী কর্মীকেই বিদেশ যাওয়ার আগে বর্হিগমন বিভাগের গঠিত কমিটির কাছে সাক্ষাত দিয়ে উত্তীর্ণ হলেই কেবল মিলছে বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র। আর এখানে সাক্ষাত দিতে এসে একের পর এক নারী কর্মী ধরা পড়ছেন।

সর্বশেষ ৩ মার্চ রোববার দুপুরে জনশক্তি কর্মসংস্থাণ ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক যুগ্ম সচিব মো. আতাউর রহমানের দফতরে বিদেশ যাওয়ার আগে সাক্ষাত দিতে এসে ট্রেনিং না নেয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে ওইসব নারীদের আবারো ট্রেনিং করতে পাঠানো হয়।

ঠাকুরগাও টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার থেকে ট্রেনিং নিয়ে সাক্ষাত করতে আসা ৪০ বছর বয়সী রওশান আরা ও রেনু আরা বেগমকে ডাকা হয় পরিচালকের রুমে। এসময় জাফর ইন্টারন্যাশনালের স্বত্তাধিকারীও উপস্থিত হন। পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রথমে রওশন আরার কাছে জানতে চান- আপনি কোথায় ট্রেনিং নিয়েছেন। ঠাকুরগাঁও জানালে তিনি তার কাছে জানতে চান, ঠাকুরগাও এ কি ট্রেনিং হয় ? নাকি এমনি সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছে ? আরবী শিখেছেন কিছু।

‘আচ্ছা বলেন তো, ‘আমি বিপদে আছি’ এটার আরবি কি। কারণ ওখানে গেলেই আপনার বিপদই বেশী হবে। আপনি সেখানে গেলে নির্ঘাত ঝামেলায় পড়বেন। তখন রাত ৩টা বাজে আমাকেই ফোন করে বলবেন, স্যার আমি তো বিপদে আছি। আমাকে নিয়ে যান, না হলে আমি কালকেই মরে যাবো!’ এরপর তিনি বলেন, আচ্ছা বলেন তো আতিকা খুলুস অর্থ কি। একথা বলার পর আমতা নামতা শুরু করেন মহিলা। তার কাছে আবার প্রশ্ন করা হয় আচ্ছা বলেন তো আতিনি খুলুস অর্থ কি। তখন মহিলা বলেন, মোবাইল। এসময় পরিচালক তার কাছে জানতে চান, আপনি কি আসলেই ট্রেনিং সেন্টারে গেছেন কি-না ? আমি বিপদে আছি এর অর্থ হলো আনাফি মুশকিলা। আমাকে সাহায্য করো এর অর্থ কি জানতে চাইলে মহিলা এরও কোন উত্তর দিতে পারেননি। এসময় অবশ্য নারী কর্মী পরিচালককে বলেন, আমি ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হওয়ার সময় শুধু একবার গেছিলাম। তাল্লাজাকি অর্থ কি। আপনি বিদেশে গেলেই প্রথমে এই শব্দটার সাথে সাক্ষাত হবে। এটার কোন উত্তর দিতে পারেননি তিনি। এরপর ডাকা হয় রেনু আরা বেগমকে। রেনু আরা জানান তিনিও ঠাকুরগাও এর একই সেন্টার থেকে ট্রেনিং নিয়েছেন। “পুতুর গাদা আসা” এটা কি জিনিস- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি। তখন পরিচালক বলেন, এর অর্থ তো আমি না। আমি কে বলে আতিহি।

‘আনা মাবাদ্বিক রোজ’ অর্থ কি। তখন বিদেশগামী নারী কর্মী পরিচালককে বলেন, ভাত না ? তখন পরিচালক তাকে পাল্টা বলেন আরে আপনি আমাকে প্রশ্ন করতেছেন কেনো ? আচ্ছা বলেন তো মামা কে। পুরুষ না মহিলা। তখন মহিলা বলেন, পুরুষ। এসময় পরিচালক আতাউর রহমান তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনিতো আরবি ভালোই শিখেছেন ? শিখা খুব ভালোই হইছে। টিটিসিতে যাননি তাহলে উত্তর দিবেন কেমনে ? তখন রেনু আরা বলেন, না স্যার আমি ট্রেনিং সেন্টারে গেছি। তাহলে কি শিখছেন ? ঘোড়ার ডিমও তো শিখেন নাই।

আচ্ছা বলেনতো, শুক্কার কি আর মিলো কি। দুটো দেখতে একই জিনিস। এরও উত্তর দিতে পারেননি। শুক্কার হলো চিনি আর মিলো হলো লবন।

এসময় পরিচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওখানে যাওয়ার পর আপনাকে যখন মাইর দিবে, বারান্দায় ফেলে রাখবে, তখন দুতাবাস থেকে আউটপাশ দিয়ে বিমানে তুলে দিবে। পরে দুজনকেই পরিচালক আবার একমাসের ট্রেনিং নিয়ে আসতে বলেন।
পাশে দাড়ানো জাফর ইন্টার ইন্টারন্যাশনালের স্বত্তাধিকারী পরিচালককে উদ্দেশ্য করে পরিচালক আতাউর রহমান বলেন, আপনারা শুধু এদের দুই এয়ারপোর্ট পার করে দিতে পারলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু এরপর সব দায় এসে পড়ে আমাদের উপর।

এমন কথার জবাবে এজেন্সীর মালিক পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, স্যার আপনারা নারী শ্রমিক বিদেশে পাঠানোই বন্ধ করে দেন। আমরা মালিক। আমরাও নারী শ্রমিক আর পাঠাতে চাই না ? তিনি বলেন, আমার দালাল ওনাদের ট্রেনিং করাইয়া আইন্যা আমার হাতে সার্টিফিকেট দিছে। আমি তো আর সেখানে যাইনি। তাদের নাম ঠিকানা আমি অনলাইনে দেখেছি। স্যার ট্রেনিং না করিয়ে ট্রেনিং সেন্টার থেকে সার্টিফিকেট দেয়, এটা তো আপনার ডিজিও জানে ? কিন্তু সার্টিফিকেট জাল পাইলে অমাাকে পানিশমেন্ট দেন স্যার। আমার কোন আপত্তি নাই। ওরা আমাকে যেটা বলেছে ট্রেনিং সেন্টারে ওদেরকে ১৬-১৭টি কথা শিখানো হয়। এরপর সিলেটের ট্রেনিং সেন্টার থেকে আসা দুজন নারী কর্মীর কাছে প্রশ্ন করা হলে তারা দু একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেন। আল আব্বাস ইন্টারন্যাশনালের দুজন কর্মীর মধ্যে একজন এরআগে দুবাই ছিলেন বলে জানান। পরে দুজনকেই বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেন পরিচালক।
অভিযোগ রয়েছে সারাদেশে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে এক শ্রেনীর দালালদের যোগসাজশে বিদেশগামীরা শুধু ভর্তি হন। এরপর তারা চলে আসে। পরে তারা সার্টিফিকেট হাতে পেয়ে যায়। তবে কোন কোন ট্রেনিং সেন্টার পুরো একমাসের ট্রেনিং দিলেও নারী কর্মীরা ভাষা শিখতে পারেন না।

এপ্রসঙ্গে পরিচালক আতাউর রহমান বলেন, আসলে যেসব নারী কর্মী বিদেশে যাচ্ছে এদের অনেকেই বাংলাই ঠিকভাবে পড়তে জানে না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এরজন্য আমাদের টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের শিক্ষকরাও কম দায়ী না। সমস্যা হচ্ছে আমাদের এখন জনবল সংকট। নতুবা অনেক ট্রেনিং সেন্টারের অধ্যক্ষকে আমি এসব অভিযোগে শাস্তিমূলক বদলী করে দিতাম। কারণ এভাবে বিদেশে শ্রমিক গিয়ে সমস্যার কারণে ফিরে এলে আমাদের বদনাম হয়, সরকারের বদনাম হয়।