কুয়াশায় দূরপাল্লার বাস ও বিমানের শিডিউল বিপর্যয়

প্রবাসীকণ্ঠ ডেস্ক:
প্রায় এক মাস ধরে ঘন কুয়াশার কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ও মাওয়া ঘাটে রাতের বেলা ফেরি চলাচল করছে না। কোনোদিন চললেও গভীর রাতে চরে আটকা পড়ার ঘটনা ঘটছে। সারা রাত ফেরি বন্ধ থাকায় দীর্ঘ যানজটে পড়তে হচ্ছে খুলনা বিভাগসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের দূরপাল্লার নাইট কোচের গাড়িগুলোকে। এতে ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে দূরপাল্লার বাস কোম্পানিগুলো। কুয়াশার কারণে একই অবস্থা বিমানেও। গতকাল প্রথম প্রহরে ঘন কুয়াশার
কারণে বন্ধ করে দেয়া হয় হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচল।
পরে সাড়ে ছয় ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর পুনরায় বিমান চলাচল শুরু হয়। বিমানবন্দরের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সহকারী পুলিশ সুপার তারিক আহমেদ জানান, ঘন কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে শুক্রবার ভোর চারটা থেকে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। পরে সকাল সাড়ে ১০টার পর কুয়াশা কেটে গেলে চলাচল স্বাভাবিক হয়। উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ থাকার কারণে আটটি ফ্লাইট গন্তব্যে দেরিতে পৌঁছায়।
ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ ও গুলিস্তানসহ বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ বঙ্গের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুয়াশার কারণে রাতে ফেরি বন্ধ থাকছে। এতে মাওয়া ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটের দুই পাশে গাড়ির লাইন ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। অন্যদিকে ঘন কুয়াশার প্রভাবে মহাসড়কে নৈশ কোচগুলো চলাচল করছে প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে। কোথাও কোথাও কুয়াশার প্রকোপ বেশি থাকায় ১০/১৫ হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার মাঝখানের সাদা দাগ দেখে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়েছে পরিবহন কর্তৃপক্ষ। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে নৈশ কোচের ট্রিপ সংখ্যা। যে কোচগুলো ছাড়া হচ্ছে তাও সঠিক সময়ের চেয়ে ১/২ ঘণ্টা দেরিতে। অন্যদিকে যেসব কোম্পানির গাড়ি কম তারা হিমশিম খাচ্ছে যাত্রী সেবা দিতে।
শুভ বসুন্ধরা পরিবহনের সুপারভাইজার আজহার আলী মানবজমিনকে জানান, আমরা নতুন কোম্পানি। গাড়িও বড় বড় কোম্পানির মতো অত বেশি নেই। খুলনা থেকে ছেড়ে আসা গাড়ি দুপুরে ঢাকায় পৌঁছলে রাতে সেটা আবার ছেড়ে যায় খুলনার উদ্দেশে। কিন্তু এখন খুলনা থেকে সকালে ছেড়ে আসা গাড়ি পৌঁছতে রাত ৮/৯টা বেজে যাচ্ছে। এই জন্য রাত সাড়ে আটটার ট্রিপ ছাড়তে হচ্ছে ১০টার দিকে। কারণ চালক ও হেলপারদের রেস্ট ও গাড়ি ধোয়া মোছার প্রয়োজন থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। প্রায় একই অবস্থা ঘটে মাওয়া ঘাটেও। বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন চৌধুরী জানান, শুক্রবার সকালে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি ছাড়লে কুয়াশার কারণে সকাল পৌনে ৮টার দিকে পাঁচটি ফেরি মাঝ নদীতে যাত্রী ও যানবাহন নিয়ে চরে আটকা পড়ে। পরে সকাল ১০টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। শিমুলিয়া ঘাট অংশেও মাঝ নদীতে আটকা পড়ে পাঁচটি ফেরি। পরে কুয়াশা কমে গেলে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয়। ঘাটে ফেরে আটকা পড়া ফেরিগুলো।
মাওয়া ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটের এই চিত্র প্রায় প্রতিদিনের। রাতের বেলা ফেরি চলাচল বন্ধ থাকলেও লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক থাকে। তবে কুয়াশা বেশি পড়লে লঞ্চ ও ফেরি দুটিই বন্ধ করে রাখা হয়। সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকা ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে ছেড়ে আসা গাড়িগুলো থমকে যায় ফেরিঘাটে এসে। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ যাত্রীদের।
যশোর থেকে ঢাকায় আসা আদনান আহম্মেদ নামের এক যাত্রী বলেন, সাধারণত যশোর থেকে ঢাকায় আসতে সাড়ে পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় ঘণ্টা সময় লাগার কথা। কিন্তু এখন রাতে ফেরিঘাটের সমস্যার কারণে একদিন সন্ধ্যায় উঠলে পরের দিন সন্ধ্যায় এসে পৌঁছতে হচ্ছে। মাহবুব মোল্লা নামের অপর এক যাত্রী বলেন, রাতে ফেরি বন্ধ থাকায় লঞ্চ পারাপার গাড়িতে এসেছিলাম। কিন্তু কুয়াশার কারণে লঞ্চও বন্ধ হয়ে যায়। তাই সারারাত গাড়ির ছিটে ঘুমিয়ে সকালে পার হয়ে ঢাকায় এসেছি।
ঈগল পরিবহনের ম্যানেজার হাদিউজ্জামান মিঠুন মানবজমিনকে বলেন, কুয়াশার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের রুটে আমাদের রাতের ট্রিপ অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে ২০টি গাড়ি ছাড়া হলে এখন সেখানে ছাড়া হচ্ছে মাত্র ১০টি। একদিকে রাতে ফেরি চলছে না। অন্যদিকে রাস্তায় খুবই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার নাঈম হোসেন বলেন, আমাদের গাড়ি অনেক তাই ট্রিপ কমানো হচ্ছে না। তবে গাড়ি ছাড়া ও ফিরে আসার সময় ঠিক রাখতে পারছি না। ঢাকা থেকে খুলানায় যেতে যে সময় লাগার কথা রাতে ট্রিপে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। তবে সকাল থেকে দিনের বেলার ট্রিপে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন নৈশ কোচের এই দুরবস্থা আরো কয়েকদিন চলতে পারে। কারণ শীতকাল হওয়ায় ঘন কুয়াশা আরো বেশ কিছুদিন থাকতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয় বিভাগের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্য প্রবাহ। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গা জেলায় নেমেছে সাড়ে ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াসে। উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয় পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় শীত বেড়েছে বাংলাদেশে। এই শৈত্য প্রবাহ চলতে পারে আরো দুই এক দিন। তবে শীত মৌসুমে প্রতিদিনই মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশার দাপট থাকতে পারে।সুত্র: মানবজমিন