প্রবাসের তারকা : দাতো সেলিম

Dato-Salim9

 

পৃথিবীতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা পরবর্তী জীবনে বিখ্যাত হয়েছেন, স্বনামে ধন্য হয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী বিল গেটস প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করতে পারেননি। পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই নেমে পড়েন তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশে। জন্ম দেন মাইক্রোসফটের। অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস কলেজ জীবন শেষ করতে পারেননি। উদ্ভাবনী নেশায় পেয়ে বসে তাকে। শিক্ষা জীবনে সফল না হলেও কর্মজীবনে বিখ্যাত হয়েছিলেন তিনি। মার্ক জাকারবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অসমাপ্ত রেখেই প্রতিষ্ঠা করেন ফেসবুক। পরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তার নাম। আমাদের দেশেও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। তাদের মধ্যে অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছেন, আবার অনেকে নিজ পরিশ্রম ও দক্ষতায় সাফল্য অর্জন করছেন। নিজ কর্মগুণে তুলে ধরছেন বাংলাদেশের নাম। অবদান রাখছেন জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে।
শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া সফল ব্যবসায়ী, উদ্যেক্তা, প্রবাসী ব্যক্তিত্ব দাতো সেলিমের জীবন ও সাফল্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরী করেছেন প্রবাসী কণ্ঠের বিশেষ প্রতিবেদক আকতার হোসাইন।

জীবন একটা প্রতিযোগিতা
‘জীবনটা একটা প্রতিযোগিতা। দৌঁড়ই হলো এখানে একমাত্র খেলা। নিয়ম বলে এখানে কোনো কথা নেই, শুধু তোমাকে দৌঁড়াতে হবে। কেউ কেউ দৌঁড়ায় সামনের দিকে আর কেউ কেউ পেছন দিকে। এখন তুমি ঠিক করে নাও কোন দিক ধরে দৌঁড়াবে, তবে খেলায় যখন নেমেছো অবশ্যই তোমাকে জয়ী হতেই দৌঁড়াতে হবে। আর সেই দৌঁড়টি হবে সামনের দিকে।’ – জে ডিইক এর এই প্রেরণাময় বাণীটিই মনে প্রাণে ধারণ করেছিলেন সেলিম। শৈশব থেকেই সেলিম স্বপ্ন দেখতেন বড় হওয়ার। বড় হয়ে মানুষের জন্য কিছু করার। এই বোধশক্তি তাকে সব সময় প্রেরণা দিতো সামনে এগিয়ে যাওয়ার। বুদ্ধি হবার পর থেকেই সেলিম বিশ্বাস করতেন, জীবন একটা প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় টিকতে হবে সফলতার সঙ্গে, তবে কাউকে কষ্ট দিয়ে নয়। সেলিমের বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। একেবারেই শৈশবকাল। তখন তিনি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তেন। চাচা আকতার হোসেনের আদরের ভাতিজা ছিলেন সেলিম। বাবা শামসুদ্দিন তখন জীবিকা নির্বাহের জন্য যশোরে থাকতেন। তাই মুন্সিগঞ্জের নিজ বাড়িতে শিশু সেলিমকে গাইড দিতেন তারই আপন চাচা। চাচার সংস্পর্শে এসে বাংলা, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রাথমিক স্টাডি রপ্ত করে শিক্ষকদের তাক লাগিয়ে দিতেন সেলিম। তাই একদিন সেলিমের বাবাকে ডেকে নিয়ে চাচা বললেন, জানিস, ‘ওর মেমরি ভালো। যা পড়াই সবই সে মনে রাখতে পারে।’

বিক্রমপুরের মানুষ কিন্তু ব্যবসায়ী
শৈশব থেকেই পড়াশুনার প্রতি সেলিমের প্রবল আকর্ষণ ছিল। তার পরিবার খুব বেশি স্বচ্ছল ছিল না। এ কারণে বছরের প্রথম ছয় মাস যশোরে বাবার সঙ্গে থাকতে হতো। পরের ছয় মাস বাড়িতে পড়াশুনা করে বার্ষিক পরীক্ষা দিতেন সেলিম। এভাবে শিক্ষাজীবন চালিয়ে নেওয়া তার জন্য কঠিন হয়েছিল। তারপরও অনেক কষ্টে চাচার সহযোগিতায় নিজ এলাকার স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন সেলিম। একদিন দাদা তাকে ডেকে বললেন, ‘সেলিম তুইতো চাকরি করবি না। চাকরির জন্য পড়াশুনা লাগে। বিক্রমপুরের মানুষ কিন্তু ব্যবসায়ী। তুই ব্যবসার দিকে মন দে।’
নিকটজনের এই পরামর্শ তার শিক্ষাজীবনে ভাটা পড়ে। অথচ সেলিম তখন বিক্রমপুরের শ্রীনগরের হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তেন।

ভাগ্যের অন্বেষণে ঢাকার ফুটপাতে
স্বজনদের সঙ্গে অভিমান করে বাড়িতে শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন সেলিম। ঢাকার ফুটপাতে তখন কাপড় ব্যবসা করতেন তার বন্ধু নূর আলম। তার কাছে চলে এলেন সেলিম। থাকার জায়গা ছিল না। তাই বন্ধুর সঙ্গে বাসার ফোরেই রাত কাটাতেন তিনি। গুলিস্তানেই বন্ধুর সঙ্গে কাপড় বিক্রি করতেন। ব্যবসায় লাভ হওয়ায় মালিক কাজল খা তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। পরে তাকে ফুটপাত থেকে পদোন্নতি দিয়ে রেলওয়ে সুপার মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকানের দায়িত্ব দেন। এসময় তিনি ব্যবসায় নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দেন। এমনকি এসময় ৬০ টাকার একটি শার্ট ৯৬০ টাকায় বিক্রি করে মালিককে তাক লাগিয়ে দেন। পরে মালিকপক্ষ কাপড় বিক্রেতা থেকে তাকে পদোন্নতি দিয়ে ম্যানেজারের দায়িত্ব দেন।

মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে পাসপোর্ট
কাপড় বিক্রির পাশাপাশি সেলিম স্বপ্ন দেখতেন উন্নত জীবন গড়ার। নিজের জীবনকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তার লক্ষ্য। এজন্য বিদেশে গিয়ে জীবন পাল্টে ফেলার টার্গেট নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার টাকা পাবেন কোথায়? কিনে আনেন একটি মাটির ব্যাংক। জমানো শুরু করলেন টাকা। একসময় সেই ব্যাংক ভেঙে পাসপোর্টের জন্য টাকা জমা দেন। তার বোন জামাই থাকতেন সিঙ্গাপুরে। তাকে অফার দিলেন সিঙ্গাপুরে আসার জন্য। সিঙ্গাপুর তখন শুধু সেলিমের জন্যই নয়, সবার কাছেই ছিল এক স্বপ্নের দেশ। সেই দেশে যাওয়া সত্যিই ভাগ্যের। ভিসাও পেয়ে যান তিনি। কিন্তু যেতে টাকা লাগবে আড়াই লাখ। এতো টাকা পাবেন কোথায়? চিন্তায় পেয়ে বসে তার মা ও তাকে। শুরু হলো মা-ছেলে মিলে টাকা সংগ্রহের অভিযান। ছুটে গেলেন স্বজনদের কাছে। সেলিমের সিঙ্গাপুরে যাওয়া তখন এলাকাবাসীর জন্য ছিল এক বড় ধরণের সারপ্রাইজ। অদম্য সেলিম অবশেষে ম্যানেজ করলেন টাকা। বিমানে উড়লেন সিঙ্গাপুরের পথে। এক নতুন জীবনের সন্ধানে। পেছনে ফেলে গেলেন তার কষ্টের শৈশব, না পাওয়ার বেদনা, দূরন্ত বাসনা।

সিঙ্গাপুর থেকে মালয়েশিয়া : টানির্ং পয়েন্ট
সিঙ্গাপুরেই শুরু হলো সেলিমের প্রবাসী জীবন। তনসিন কনস্ট্রাকশনের অধীনে তিনি প্রথমে শ্রমিক এবং পরে সুপারভাইজার হিসেবে ভালো বেতনে চাকরি করতেন। পরে নিজেই ব্যবসা শুরু করেন তিনি। জনশক্তি আমদানী শুরু করেন বাংলাদেশ থেকে। তার হাত দিয়েই প্রায় চার হাজার বাংলাদেশীর কর্মসংস্থান হয় সিঙ্গাপুরে। সেখানে কার্পেট ও পার্টস আমদানীকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন নিজেকে। পরে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালে মালয়েশিয়া যান সেলিম। তার ব্যবসার উন্নয়ন ও জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া যাত্রা ছিল তার ভাগ্যের টার্নিং পয়েন্ট। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানীর ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিত্ব তিনি। এ খাতের উন্নয়নে রয়েছে তার নানা অভিনব চিন্তা। এছাড়া মালয়েশিয়ায় আইটি রিলেটেড সফটওয়ার ও হার্ডওয়ার বিজনেস ডেভেলপ করেন তিনি। তার শ্রমে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের নাম হলো, এজিডি আইটি সলিউশন এসডিএন বিএইচডি। ( ইউর ইমাজিনেশন আওয়ার সলিউশন শ্লোগানে প্রতিষ্ঠিত আইটি ব্যবসায় প্রচুর প্রবাসী বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশেও স্থাপন করেছেন আইটি ট্রেনিং সেন্টার। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে অর্জন করেন এশিয়া প্যাসিফিক সিএসআর এ্যাওয়ার্ড।

সফল ব্যবসায়ী হিসেবে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ তাকে ‘দাতো’ উপাধি দেয়া হয়। মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের কাছে তিনি ‘দাতো সেলিম’ হিসেবেই পরিচিত। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলে নিজেকে তৃপ্ত মনে করেন সেলিম। নিজ গ্রামের বাড়িতে মসজিদ, মাদরাসার উন্নয়নে অকাতরে দান করেন তিনি। মালয়েশিয়ার রাজধানীতে ব্যবসার সূত্রে পরিচয় হয় জেসমিন বিনতে শেখ ফরিদ নামে এক তরুণীর সঙ্গে। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। আর বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। পরে তাকেই জীবন সঙ্গিনী করার সিদ্ধান্ত নেন সেলিম। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, দুর্ভাগ্যবান তারাই, যাদের প্রকৃত বন্ধু নেই। বলেন, আমি আমার স্ত্রীকে প্রকৃত বন্ধু হিসেবে পেয়েছি।
বিদায়ের সময় এই প্রতিবেদককে দাতো সেলিম জানান, যেখানেই থাকবো, বুকে থাকবে বাংলাদেশ।