ঢাকা-জেদ্দা-সিলেট রুটে যাত্রীদের সঙ্গে বিমান কর্মীদের অসদাচরণ

bowing-373-800

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক

সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ছাগলি গ্রামের লিয়াকত আলী সৌদি আরবে থাকেন ১৭ বছর ধরে। গত ২৪ মে বৃহস্পতিবার সেখানকার স্থানীয় সময় রাত ২টা ৩০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে (বিজি-১৩৬) জেদ্দা থেকে সরাসরি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা। রাত দেড়টায় কিং আবদুল আজিজ বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন ফ্লাইটের তখনও কোন খবর নেই। এ তথ্য পেয়েই তার মন খারাপ হয়ে যায়। সেদিকে বোর্ডিং কার্ড নেয়ার জন্য বিমানের কাউন্টারে দীর্ঘলাইন বাঙালিদের। লাইনে দাঁড়িয়ে অস্থির তারা; কারণ মালামাল বুকিং নেয়া কর্মচারীর অসদাচরণ ও ওপেন ঘুষ নেয়ার বিষয়টি কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না। একদিকে বিমানের সিডিউল বিপর্যয় ও অন্যদিকে ঘুষের চিত্র শুধু লিয়াকত আলীকেই বিমর্ষ ও ক্ষুব্ধ করে তুলেনি, যারা ওমরা হজ শেষে দেশে ফিরছিলেন তাদেরও মর্মাহত করেছে। এখানেই শেষ নয় বিমানের কাহিনী, ফ্লাইটে ওঠার পর বিমানের সেবিকা ও সেবকের কেবিন ক্রু ধৈর্যহীনতা ও বদমেজাজি আচরণ হতাশ করেছে যাত্রীদের। ২৪ মে রাত সাড়ে ১২টায় কিং আবদুল আজিজ বিমানবন্দরের হাজী টার্মিনালে দেখা যায়, দীর্ঘলাইন বিমানের কাউন্টারে। মালামাল বুকিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন ত্রিশোর্ধ বয়সী এক যুবক, যার বাড়ি সিলেট জেলায়। তিনি সারিবদ্ধ ওমরা হজ ফেরত যাত্রীদের সঙ্গে খুব অসৌজন্যমূলক আচরণ করে মালামাল (লাগ্যাজ) বুকিং নিচ্ছিলেন। প্রথমেই জিজ্ঞেস করছিলেন কার কয়টি ‘লাগেজ’ রয়েছে। এক ব্যক্তির দুটির অধিক লাগেজ থাকলেই ওপেন বলছিলেন ‘তাড়াতাড়ি লাগেজ প্রতি একশ’ (একশ রিয়াল) টাকা বের করেন। সময় কম’। যারা টাকা চাওয়ার কারণ জানতে চাচ্ছিলেন তাদের সঙ্গে কথা না বলে তিনি পেছনের যাত্রীর মালামাল বুকিং নিচ্ছিলেন। অনেক যাত্রী প্রশ্ন করছিলেন, নিয়মানুযায়ী পঞ্চাশ কেজি মাল তারা বিমানে বহন করতে পারেন। তবে ছোট ব্যাগ থাকায় অনেকের এর চেয়েও কম পরিমাণ মালামাল তিনটি ব্যাগে আছে। তা বুকিংয়ের অনুরোধ করলে বিমানের বুকিং কর্মী বলেন, ‘এক যাত্রীর দুটি ব্যাগের বেশি বুকিং দেয়া যাবে না। মালামাল কম হোক তাতে কিছু যায় আসে না। ব্যাগ প্রতি একশ’ রিয়াল দিতেই হবে’। তার এমন কথাবার্তায় নিরীহ ওমরা ফেরত যাত্রীরা বিমান ছেড়ে দেয়ার আতঙ্কে বাধ্য হয়েই তার হাতে তুলে দেন সৌদি রিয়াল। শত শত যাত্রীর সামনে একদিকে মালামাল বুকিং ও অন্যদিকে শুধু পকেটে রিয়ালই ঢুকাচ্ছিল সেই বিমানকর্মী। আর তার সামনেই কম্পিউটারে বসা কর্মকর্তা পাসপোর্ট নিয়ে যাত্রীদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন বর্ডিং কার্ড। অন্যায় ও অবৈধভাবে আদায় করা ঘুষের টাকা যায় তিনিসহ আরও কর্মীদের পকেটে। টার্মিনালের চারদিকে সিসি ক্যামেরা থাকা ও শত শত মানুষের সামনে এভাবে ঘুষ নেয়ার দৃশ্য অবাক করে হাজীদের।

ওই টার্মিনালে কথা হয় সাজেদা বেগম নামের একজন হাজীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বিদেশের মাটিতে মাতৃভূমির মানুষ কাছে পেলে প্রবাসীরা আনন্দিত হয়। অথচ যে ছেলেটি মালামাল বুকিং দিচ্ছিল সে নিজেও বাংলাদেশি। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, দেশি লোকদের জিম্মি করে সে যেভাবে টাকা আদায় করেছে তা বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। তার মতো কর্মীরা বিদেশে গিয়ে সে দেশের অনেক মানুষকেও ঘুষ লেনদেন শিখিয়ে ফেলেছে।’

এইত গেলো বিমান কর্মীদের লাগেজের সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার ও ঘুষ আদায়ের কথা। এরপর হাজীরা আট নম্বর কাউন্টার দিয়ে প্রবেশ করেন ইমিগ্রেশনে। দীর্ঘলাইনে থেকে মালামাল বুকিং দিয়ে ইমিগ্রেশন শেষে জানা যায়, যথাসময়ে বিমানের ফ্লাইট ছাড়ছে না। কখন ছাড়বে তাও কেউ জানে না। অপেক্ষার প্রহর গুণে খবর আসে আড়াইটার ফ্লাইট ছাড়বে সাড়ে ৪টায়। সময়মতো ফ্লাইটে ওঠানো হয় হাজীসহ অন্য যাত্রীদের। সবাই নিয়ন্ত্রণে চলে যান বিমানের। শুরুতেই চোখে পড়ে বিমান সেবিকাদের চোখে ঘুমের ছাপ। যাত্রীদের সেবায় তেমন মনস্ক দেখাচ্ছিল না। কিছুটা উত্তেজিত হয়ে কথা বলছিলেন সিটে বসার জন্য। মধ্য বয়স্ক এক সেবিকা অনেকটা খটখটে মেজাজি আচরণ করেন কয়েক যাত্রীর সঙ্গে। একজন হাজী দ্বিতীয়বার সামান্য বাদাম চাইলেও তার ট্রলিতে রেখেও তা দেয়া হয়নি। অন্য একজন প্রবাসী লিয়াকত আলীকে এক গ্লাস পানিও দেয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে সিলেটের জকিগঞ্জের লিয়াকত আলী বলেন, ‘প্রথমে অর্ধেক গ্লাস পানি দেয়া হয়। কিছুক্ষণ পর আমার খুব পিপাসা পেলে আমি কেবিন ক্রু মহিউদ্দিনের কাছে গিয়ে দেখি তিনি ব্রেডের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খাচ্ছেন। আমি অনুরোধ করে এক গ্লাস পানি চাইলে তিনি বলেন, ‘পরে আসেন’। এরপর ২০ মিনিট চলে গেলেও কোন খবর নেই’। লিয়াকত আলী যখন এ বিষয়ে কথা বলছিলেন ঠিক তখনই ট্রলি নিয়ে ‘চা-কফি’ বলে যাত্রীদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে এটা সবার জন্য নয়। ১০ জন চাইলে তিনজনকে দিয়েছেন, বাকিদের পরে বলে চলে গিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ট্রলি নিয়ে যাওয়ার সময় ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক এক যাত্রী পানি চাইলে কিছুটা রুক্ষ ভাষায় মহিউদ্দিন পরে বলে চলে যান। তাকে আর পানি দেয়া হয়নি। এসব দৃশ্য দেখে লিয়াকত আলী বলেন, ‘আমরা দেশকে ভালোবাসি। তাই বিদেশি ফ্লাইটে না ওঠে দেশি ফ্লাইটে আসা-যাওয়া করি। বিমানের কর্মীদের যদি এমন আচরণ হয় তাহলে এই দুঃখ বলার জায়গা কোথায়। কারণ যারাই চাকরিতে এসেছেন, বেশির ভাগই তদবিরে। এদের বিচার কে করবে’। তিনি বলেন, অথচ বিমানে চাকরি নেয়ার সময় সেবিকা-সেবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাদের বলা হয়, বিমান আকাশে ওড়ার পর থেকে মাটি ছোঁয়া পর্যন্ত যাত্রীদের পরিসেবা দেয়াই তাদের পেশাদার কাজ। তাদের মধুরভাষী, সহনশীল হতে হয়।

জেদ্দা থেকে সিলেটের উদ্দেশে বিমানের ফ্লাইট যখন ওড়াল দিল, তখন সে ফ্লাইটে ঢাকা, চট্টগ্রামের যাত্রীও ছিলেন। সরাসরি ফ্লাইট না পেয়ে তারা ওই ফ্লাইটেই নিজেদের গন্তব্যস্থলে যাচ্ছিলেন। কথাবার্তার ফাঁকে জানা যায়, বিমানে সিডিল বিপর্যয় ও সেবিকাদের বদমেজাজি আচরণ প্রায়ই হয়ে থাকে। গত ১২ মে ভোর সাড়ে ৪টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যে ফ্লাইটটি ছাড়ার কথা ছিল, তা ভোর সাড়ে ছয়টায় ওড়ে জেদ্দার উদ্দেশ্যে। এরকম প্রতিনিয়ত সিডিউল বিপর্যয় ও কর্মীদের অসাদচরণে যাত্রীরা দিন দিন আস্থা হারিয়ে ফেলছেন রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই এয়ারলাইন্সের প্রতি।

দৈনিক সঙবাদ