অবশেষে মায়ের কোলে ‘একুশ’

ekush-2

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

বুধবার আদালত থেকে একুশকে জিম্মা নেন শাকিলা আক্তার-মো. জাকের ইসলাম দম্পতি। নিঃসন্তান এই দম্পতির ঘরে সন্তান আসায় আনন্দে আত্মহারা শাকিলার বাবা এম এ খালেক (মাঝে)। ছবি: জুয়েল শীল
আজ বুধবার আদালত থেকে একুশকে জিম্মা নেন শাকিলা আক্তার-মো. জাকের ইসলাম দম্পতি। নিঃসন্তান এই দম্পতির ঘরে সন্তান আসায় আনন্দে আত্মহারা শাকিলার বাবা এম এ খালেক (মাঝে)। ছবি: জুয়েল শীল
জন্মের পরই শিশুটির থাকার কথা ছিল মায়ের কোলে। কিন্তু তার বদলে ঠাঁই হয়েছিল ময়লার স্তূপে। অবশেষে জন্মের প্রায় দেড় মাস পর মায়ের কোলে ফিরেছে একুশ নামের শিশুটি। আজ বুধবার আদালত থেকে তাকে জিম্মা নিয়েছেন শাকিলা আক্তার-মো. জাকের ইসলাম দম্পতি।

আজ বুধবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে প্রথম অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ (মহানগর শিশু আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত) জান্নাতুল ফেরদৌসের আদালতে একুশকে শাকিলা আক্তারের কোলে তুলে দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার দেবাশীষ কুমার রায়।

শিশুটিকে হস্তান্তরের আগে বিচারক একুশের নামে শিক্ষাবিমাসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখেন। কাগজপত্র পরীক্ষা শেষে তিনি নবজাতকটির নতুন অভিভাবকের উদ্দেশে বলেন, শিশুটির নামের সঙ্গে একুশ থাকতে হবে। কারণ আদালত থেকে একুশ হিসেবে ওকে দিচ্ছি। একুশের সঙ্গে চাইলে অন্য নাম দেওয়া যেতে পারে।

পরে বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আমার স্বামী অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) আছেন। তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন। কিন্তু তারপরও আমি এসেছি বিপন্ন একটি শিশুকে বাঁচানোর জন্য। রাষ্ট্রীয় ও মানবিক দায়িত্ব পালনের জন্য।’

গত ২৯ মার্চ কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে শিশু একুশকে শাকিলা দম্পতির জিম্মায় দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। এর মধ্যে একটি শর্ত ছিল, শিশুটির প্রকৃত মা-বাবার সন্ধান পাওয়া গেলে এবং তাঁরা নিতে চাইলে প্রমাণ সাপেক্ষে (ডিএনএ পরীক্ষা-নিরীক্ষা) শিশুটিকে ফেরত দিতে হবে। আজ বিচারক আবারও শর্তটির কথা উল্লেখ করে শাকিলা দম্পতিকে বলেন, ‘এই শর্তে আপনারা আশাহত হবেন না। কে শিশুটিকে ফেলেছেন বা কী পরিস্থিতিতে ফেলেছেন, সেটি নিশ্চিত নয়। সে কারণে জন্মদাত্রী মায়ের অধিকার সংরক্ষণের জন্য এই পথটি খোলা রাখা হয়েছে। আর আপনারা সব সময়ই শিশুটির মা-বাবাই থেকে যাবেন।’ এরপর বিচারক জন্মের পর শিশুটিকে প্রথম রক্ত দেওয়া আকবরশাহ থানার উপপরিদর্শক মো. নুরুল আলম ও শিশু আদালতের কৌঁসুলি এম এ ফয়েজকে এজলাসে ডেকে নেন। এ দুজনসহ যাঁরা শিশুটির দেখভালের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সবার অবদানের কথা তিনি উল্লেখ করেন।

এজলাস ছেড়ে যাওয়ার আগে বিচারক শাকিলা দম্পতিকে আরও বলেন, ‘আশা করি, একুশকে এমনভাবে মানুষ করবেন, যাতে সে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠতে পারে।’

গত ২৯ মার্চ আদালত একুশকে শাকিলা আক্তার-মো. জাকের ইসলাম দম্পতির জিম্মায় দেন। ছবিটি ওই দিন রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা। ফাইল ছবি
গত ২৯ মার্চ আদালত একুশকে শাকিলা আক্তার-মো. জাকের ইসলাম দম্পতির জিম্মায় দেন। ছবিটি ওই দিন রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা। ফাইল ছবি
আদালতের মধ্যে অশ্রুসিক্ত চোখে শিশুটিকে কোলে তুলে নেন শাকিলা আক্তার। এ সময় পাশে ছিলেন তাঁর স্বামী চিকিৎসক মো. জাকের ইসলাম। পরে তাঁরা সাংবাদিকদের বলেন, একুশকে যাতে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি সবাই দোয়া করবেন।

একুশকে হস্তান্তরের সময় শাকিলা আক্তারের বাবা এম এ খালেক, আইনজীবী জাহিদ মো. আল ফয়সাল চৌধুরীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি এম এ ফয়েজ বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী শিশুটিকে প্রথম বছর প্রতি তিন মাস অন্তর, দ্বিতীয় বছর ছয় মাস পরপর এবং এর পরের বছর থেকে প্রতিবছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করে তার অবস্থা জানাতে হবে। সে অনুযায়ী আগামী তিন মাস পর শিশুটিকে আদালতে এনে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।

শিশুটিকে হস্তান্তরের পর আদালত চত্বরে কাঁদতে থাকেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ নার্স শিখা ভট্টাচার্য। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘একুশকে তার মায়ের কোলে তুলে দিতে পেরে একদিকে যেমন আনন্দ লেগেছে, তেমনি খুব কষ্টও হচ্ছে। ও আমাদের খুব আদরের ছিল।’

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টায় চট্টগ্রাম নগরের কর্নেলহাট এলাকার একটি ডাস্টবিনে পাওয়া যায় শিশুটিকে। শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। একুশের প্রথম প্রহরের কিছুক্ষণ আগে শিশুটিকে উদ্ধার করার কারণে তার নাম রাখা হয় ‘একুশ’। শিশুটিকে পেতে আদালতে ১৬ জন আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ১২ জন আবেদনকারীর উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাই ও শুনানি শেষে গত ২৯ মার্চ আদালত একুশকে শাকিলা দম্পতির জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ দেন।

মুত্র প্রথম আলো অনলাইন