লিবিয়ার বন্দিশালায় শত শত বাংলাদেশী

সাজ্জাদ মাহমুদ খান

লিবিয়ার মরুভূমিতে ২০০ হাত লম্বা ঘর। জানালাবিহীন এ ঘরে বন্দি রাখা হয় শতাধিক বাংলাদেশীকে। বন্দিদের পিটিয়ে তার চিৎকার বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের মোবাইল ফোনে শোনানো হতো। বাংলাদেশে থাকা দালালদের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পৌঁছে দিতে পারলেই কেবল বন্দিদশা থেকে মুক্তি মিলত। পিটুনির শুরুতে ব্যথা পেলেও পরে আর অনুভূতি থাকত না। সাড়ে ৪ মাসে একবারও গোসল করতে দেয়া হয়নি। সারা দিনে দেয়া হতো একবার পাতলা খিচুড়ি। পিটুনি সহ্য করতে না পেরে চোখের সামনে এক যুবকের মৃত্যু দেখেছি। ভাবতে পারিনি জীবন নিয়ে দেশে ফিরতে পারব।
লিবিয়ার মরুভূমির বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে রোববার দেশে ফেরা কুড়িগ্রামের আবদুল হাই এভাবেই তার ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা করেন আলোকিত বাংলাদেশকে। সম্প্রতি লিবিয়ায় বন্দি থেকে ফেরা সুমন ও মাদারীপুরের আহমেদ আলীও তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন।
শুধু আবদুল হাই, সুমন কিংবা আহমেদ আলী নন, লিবিয়ার মরুভূমিতে বাংলাদেশী দালালদের বন্দিশালায় শত শত মানুষ বন্দি রয়েছেন। প্রিয়জনের মুখে দু-মুঠো ভাত তুলে দিতে ভিটামাটি বিক্রি করে মালয়েশিয়া, সুদানসহ মধ্যপাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে শত শত যুবক বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। দেশে থাকা শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে বিদেশে গিয়ে জীবন নিয়ে শঙ্কিত তারা। দেশে থাকা দালালদের গ্রেফতারের পর কিছু ফিরে আসছেন। তবে বেশিরভাগের ভাগ্য কী হবে, তা এখনও অজানা। সহজ-সরল সাধারণ মানুষকে বিদেশে উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়ে ভিটামাটি বিক্রির টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। জাল পাসপোর্ট ও ভিসায় বিদেশে নিয়ে বন্দি করে নির্যাতনের মাধ্যমে আরেক দফা আদায় করা হচ্ছে টাকা। বিমানবন্দর ও মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মচারীরা এদের সঙ্গে যুক্ত বলে তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন। কিছু গ্রেফতার হলেও বেশিরভাগই থেকে যাচ্ছেন অধরা।
র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ জানান, সহজ-সরল মানুষদের সচেতনার অভাবে বিপুল টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। দেশে থাকতে একদফা টাকা নেয়ার পাশাপাশি বিদেশে বন্দি করে নির্যাতনের মাধ্যমে আরেক দফা টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেকে নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করছেন। দালালদের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে বিমানবন্দরের কিছু লোকজন জড়িত। তাদের ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে। র‌্যাব এসব ব্যাপারে অভিযোগ পেলে দেশীয় দালালদের আটক করে বিদেশে থেকে বন্দিদের দেশে ফিরিয়ে আনছে। র‌্যাব ১৫৬টি অভিযানে ৪৯৬ জন মানব পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৭৬৬ জন ভিকটিমকে।
ডিবির মাধ্যমে ফিরে আসা আবদুল হাই আরও বলেন, কুড়িগ্রামের রাজিবপুরের গ্রামের বাড়িতে দালাল কালাম মুন্সি মাধ্যমে তিনি লিবিয়ায় যান। লিবিয়ায় তারা বাংলাদেশের বরিশালের সাইফুলের বন্দিশালায় ছিলেন। এ বন্দিশালার মূলহোতা সাইফুলের দুলাভাই ইসমাইল মিসরে থাকেন। সাইফুল ও তার লোকজন মারধর করে বাংলাদেশে থাকা দালাল হারুনের কাছে টাকা দিতে বলতেন। হারুন দেশে থাকা তার স্ত্রী ও পরিবারকে টাকা দিতে চাপ দেন। টাকা না দিলে বিদেশের মাটিতে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পরে স্বজনরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করলে হারুনকে আটক করে চাপ দিলে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অন্যদের ভাগ্যে কী হয়েছে, তা তিনি জানতে পারেননি। তার বন্দিশালার পাশেই আরেকটি বন্দিশালা তিনি দেখতে পেয়েছেন। তবে কত বন্দি সেখানে আছে, তা তিনি জানেন না। মারধরে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ডান কান মারাত্মক জখম হয়েছে।
ডিবি পুলিশ কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, হারুনকে গ্রেফতার করে তার মাধ্যমে আবদুল হাইকে রোববার দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এ চক্রের সন্ধান তারা পেয়েছেন। চক্রটির অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তিনি আরও জানান, আবদুল হাইকে ভিসা ছাড়াই বিদেশে পাঠানো হয়েছে। লিবিয়া যাওয়ার পর তার পাসপোর্টে ভিসা হয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে, তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চাকরি দেয়ার নামে দেশি-বিদেশি অর্ধশতাধিক চক্র প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাচার করছে। এসব চক্রের হাতে জিম্মি শত শত মানুষ বিভিন্ন দেশের বনেজঙ্গলে কিংবা বদ্ধ ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নির্যাতনের কারণে অনেকের মৃত্যুও হচ্ছে। পাচারের সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিমানবন্দরের কর্মচারীরা জড়িত। তারা টাকা খেয়ে এবং জাল ভিসার মাধ্যমেও বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি তদন্তে দুইটি ট্রাভেল এজেন্সির নামও এসেছে। এগুলো হলো গুলশানের গো এজি এবং পল্টনের সান এজ। তারা বেশি টাকার বিনিময়ে জাল ভিসায় বিদেশে পাঠানোর কাজ করে। মালয়েশিয়া পাঠানোর রুটের ব্যাপারে র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ থেকে টুরিস্ট ভিসার মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানো হয়। ইন্দোনেশিয়ার নর্থ সুমাত্রা থেকে মেদাং পোর্ট সিটি হয়ে নৌকায় করে পাচারকৃতরা যায় মালয়েশিয়ার সেলাংগড়। সেখান থেকে বনজঙ্গলের মধ্য দিয়ে পালিয়ে চলে যায় বুকিত বিতান। সেলাংগড় অনেকেই পুলিশের কাছে ধরা পড়ে জেলে যায়। লিবিয়ায় পাচারের রুট হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আবুধাবি হয়ে ইস্তানবুল হয়ে লিবিয়া। এসব েেত্র প্রত্যেকটা বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দালালদের চুক্তি করা থাকে।
সম্প্রতি লিবিয়া থেকে র‌্যাবের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসা ২৭ ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, লিবিয়ার মরুভূমিতে বাংলাদেশীদের বানানো বন্দিশালায় শত শত বাংলাদেশীই বন্দি অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। লিবিয়ার কারাগারেও বাংলাদেশী নাগরিক মানবেতর জীবনযাপন করছে। চাহিদামতো মুক্তিপণ দিতে না পারায় সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা বাঙালিদের কনডেম সেল কিংবা মেসেজ কে দিন-রাত তাদের নির্যাতন করা হয়।
লিবিয়া ফেরত মাদারীপুরের আহমদ আলী বলেন, আদম ব্যাপারী মাহবুবের মাধ্যমে ৬ লাখ টাকা দেন। মাহবুব তাকেসহ ১০ জনকে গত ঈদের ২ দিন পর পাঠিয়ে দেয় লিবিয়ায়। সেখানে যাওয়ার পর লিবিয়ান কয়েকজন নাগরিক তাদের বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করে একটি কে নিয়ে যায়। এরপর মাহবুবের পাঠানো লোকদের চিহ্নিত করে আলাদা একটি রুমে নিয়ে যায় মাহবুবের বিদেশি চক্র। এরপর একটি বন্দিশালায় নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে তার পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। ১০ দিন নির্যাতন করে টাকা আদায়ের পর তাকেসহ অন্যদের নিয়ে হাওয়ায় চালিত একটি ট্রলার ইতালির উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু সাগরে টহলে থাকা লিবিয়া পুলিশ তাদের ল্য করে গুলি ছোড়ে এবং তাদের আটক করে জেলে পাঠায়। দীর্ঘ ৬ মাস ৬ দিন জেল খাটার পর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনে। ভুক্তভোগী আহমদ আলী জানান, তাদের একটি অন্ধকার রুমে রাখা হতো। সকালে ছোট একটি রুটি আর রাতে নুডুলস খেতে দিত। দুপুরে কোনো খাবার দেয়া হতো না। লাইনের নোনতা পানি খেতে দিত। এতে অনেকের ডায়রিয়াও হয়েছে।
র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, মানব পাচারে জড়িত দালাল চক্রের একাধিক ধাপ রয়েছে। গ্রাম পর্যায়ের একজন দালাল সর্বোচ্চ ঢাকায় থাকা কয়েক জনকে চেনে। যাদের পাচার করতে এবং ভিসা করাতে আরেকটি চক্র কাজ করে। কাগজপত্র ঠিক না থাকা সত্ত্বেও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মচারী টাকার বিনিময়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে দেয়। বিমানবন্দরের কিছু কর্মচারীও চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা ভিকটিমদের ইমিগ্রেশনে পাড় করিয়ে দেয়। এরপর পাচারকারী চক্রের সঙ্গে বিমান এয়ারলাইন্সের লোকদের হাত রয়েছে। দালালরা কত সংখ্যক লোক পাঠাবে, তা আগে বিমান এয়ারলাইন্সের লোকদের বলা হলে তারা সে অনুযায়ী টিকিট রেখে দেয়। নির্দিষ্ট দেশে পৌঁছার পর সেখানকার বিমানবন্দরের কর্মচারীরাও পাচারকারীদের কাগজপত্র যাচাই করছে না। পুলিশের অপরাধ তদন্ত (সিআইডি) বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, যেসব দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, সেসব দেশেই এসব চক্র বেশি সক্রিয়। ওইসব দেশে কেউ পাচার হয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা কষ্টসাধ্য। তাই অবৈধ পন্থায় বিদেশ না যাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।