পুরুষ বেশে ৪৩ বছর সংগ্রামী নারীর

ডেস্ক রিপোর্ট : পুরুষশাসিত সমাজে পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকতে চাননি সিসা আবা দাউ এল নেমর। ১৬ বছর বয়সে বিয়ে আর ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় স্বামীর মৃত্যুও দমিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। কিন্তু নারী হয়ে কাজ জোটানো সম্ভব ছিল না বলে শেষপর্যন্ত পুরুষের বেশ ধরে কঠোর পরিশ্রমের কাজ করেছেন। আর ৪৩ বছর ধরে এভাবেই চালিয়েছেন মা ও মেয়ের সংসার।

সিসা আবা দাউয়ের জন্ম মিসরের লুক্সর শহরে। কৈশোর না পেরোতেই বিয়ে হয়েছিল সেখানেই। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই স্বামী মারা যাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়লেন তিনি। মেয়ের জন্মের পর আরও ৪০ দিন ছিলেন দেবরের সংসারে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি কিংবা বাপের বাড়ি কোনো খানেই ছিল না তার নিশ্চিত আশ্রয়। সবাই বললেন আবারও বিয়ে করতে। কিন্তু পুনরায় বিয়ে করতে মন সায় দেয়নি তার। মেয়েকে মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে পা বাড়িয়েছেন অভাবনীয় এক কঠোর জীবনে।

মিসরের গ্রামাঞ্চল বা ছোট শহরগুলোতে এখন থেকে চার দশকেরও বেশি আগে নারী হয়ে রোজগেরে জীবনযাপন করাটা সহজ ছিল না। আর হাটে বাজারে পুরুষের কাজ ছিল কঠোর পরিশ্রমের। বাধ্য হয়েই পুরুষের পোশাকআশাক জোগাড় করে পুরুষের বেশ ধরে পথে নামলেন সিসা আবা দাউ। নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে দালানে ইট ওঠানো নামানোর কাজ দিয়ে শুরু। এরপর কী করেননি এই নারী! পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইটভাটার শ্রমিকের কাজ থেকে শুরু করে বাজারে জুতা পলিশ, দোকানদারি, মাঠে ফসল কাটা সবই করেছেন তিনি।

পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করে এই নারীর কঠোর জীবন নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছে আরটি ডটকম। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সময় দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিসা আবা দাউ বলেন, ‘আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি, কিন্তু সেটা দ্বিতীয় বিয়ে করার চেয়ে ভালো ছিল। দ্বিতীয় বর খোঁজার চেয়ে নিজে ধুলাবালি খেয়ে আর শিশু মেয়েটিকে পাথর খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখাটাও আমার জন্য ভালো ছিল।’

কিন্তু সিসা আবা দাউয়ের ছদ্মবেশী পুরুষের জীবন নিষ্কণ্টক ছিল না। তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ আমাকে উৎপাত করত। কিন্তু যখন তারা দেখেছে যে, আমি সব কাজই করতে পারি, আমি শক্তিমান তখন আর কেউ আমার পিছু লাগতে সাহস করেনি।’

স্বামীর মৃত্যুর পর প্রায় সাড়ে চার দশক পার করলেও কখনোই কারও কাছে হাত পাতেননি তিনি। কঠোর পরিশ্রম করে মেয়েকে লালন-পালন করেছেন। নিজের উপার্জনেই নিজের জন্য বাড়ি বানিয়েছেন সিসা আবা দাউ। শুধু তাই নয় নিজের বাড়ির জন্য ইটগুলোও তার নিজের হাতেই বানানো। এই দীর্ঘ সময়ে যেন সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে একাই লড়ে গেছেন এই সংগ্রামী নারী। এখন তার বয়স ৬৫ বছর আর তার মেয়ের ৪৩।

১৯৮১ সালে লুক্সর শহরের এক বাজার এলাকায় জুতা পলিশের কাজ শুরু করেছিলেন সিসা আবা দাউ। প্রথম জীবনে অনেক পেশায় কাজ করলেও শেষমেশ জুতা পলিশের কাজেই থিতু হয়েছিলেন তিনি। বেশ কয়েক বছর আগেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। পাঁচ সন্তানের জননীও হয়েছে তার মেয়ে। কিন্তু মেয়ে, জামাই আর পাঁচ নাতি পুতির সংসারও তাকেই চালাতে হয়।

সম্প্রতি তার এই সংগ্রামী জীবনের কথা প্রকাশ হলে শহরের কর্মকর্তারা সিসা আবা দাউ এল নেমরকে ‘লুক্সরের শ্রেষ্ঠ মা’ পুরস্কারে সম্মানিত করেছেন। এরপর মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল সিসির হাত থেকেও নিয়েছেন পুরস্কার। কিন্তু চার দশকের পুরুষের বেশ ছাড়েননি তিনি। এখনো তার পরনে পুরুষের ঢোলা জোব্বা আর মাথায় পাগড়ি।

‘সৌদি আরবে কঠোর আইন আছে। আর এখানে মেয়েরা এখন শার্ট-প্যান্ট পরে। প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য আছে আর প্রত্যেকেরই অধিকার আছে নিজের মতো পোশাক পরার। কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার নেই কারও, জীবনের মূল কথা স্বাধীনতা।’ আরটি-এর প্রামাণ্যচিত্রে এভাবেই নিজের মনোভাব প্রকাশ করেছেন এই নারী।

পুরস্কার নিতে রাজধানী কায়রোতে যাওয়ার পর টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে সিসা আবা দাউয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তার কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা আছে কিনা। সিসা আবা দাউ জানিয়েছেন, লুক্সর শহরে একটা ছোট্ট মুদি দোকান করতে চান তিনি। এরপর লুক্সর কর্তৃপক্ষ তাকে মুদি দোকানের ব্যবসা করার লাইসেন্স দিয়েছে। এখন সেই মুদি দোকান চালাচ্ছেন তিনি।

লুক্সরের যেই বাসিন্দারা সিসা আবা দাউকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন তারা জানেন তার ব্যক্তিত্ব কত প্রখর। ফলে শ্রেষ্ঠ মায়ের খেতাব পাওয়া কিংবা রেডিও-টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রচারের পর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাওয়াতেও তার জীবন একটুও পাল্টায়নি।

স্থানীয়রা বলেছেন, ‘এখন বেশভূষা পাল্টে ফেলাটা তার জন্য খুবই কঠিন, তিনি নারী হয়ে থাকতে চান না।’

এক পুরুষ সহকর্মী বললেন, ‘আমি তাকে পুরুষ হিসেবেই গণ্য করি’, আরেকজন বলেন, ‘এক ডজন পুরুষের চেয়ে বেশি সামর্থ্যবান তিনি।’