ড. ইউনূসের নেতৃত্বে হচ্ছে জাতীয় সরকার : একান্ত সাক্ষাৎকারে কাজী জাফর

ঢাকা : কাজী জাফর আহমদ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বর্ণাঢ্য চরিত্র। প্রায় ৬০ বছর ধরে মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করছেন। বাম রাজনীতি দিয়ে হাতেখড়ি হলেও বর্তমানে তিনি জাতীয় পার্টির (একাংশ) চেয়ারম্যান। নব্বইয়ের দশকে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ রাজনীতি, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের সম্ভাবনা ও আগামী নির্বাচন নিয়ে দ্য রিপোর্টের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ।

তার গুলশানের বাসায় সোমবার সকালে দ্য রিপোর্টকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে কথা বলেছেন প্রবীণ এ রাজনীতিক।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি কথায় বলা যায়, ক্ষমতাসীন সরকার গণতন্ত্রের নাম নিশানা মুছে ফেলে দেশকে একটি পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। একটি অনির্বাচিত সরকার সংসদের সার্বভৌমত্বকে প্রহসনে পরিণত করেছে। সংসদের অধিবেশন ডাকা হয়েছিল মোদির সফর সম্পর্কে আলোচনার জন্য। কিন্তু সেখানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে সংসদকে একটি প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। বস্তুত দেশে আজ যেভাবে পুলিশী রাজত্ব চলছে, তা আমার ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে কখনও দেখিনি। শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর কোনো দেশে এ ধরনের ফ্যাসিবাদী রাজত্ব কায়েম হয়েছে কিনা তা খুবই বিরল।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

আমি মনে করি, এই সরকার জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। দেশে চলছে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট। একদিকে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যদিকে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বাংলাদেশের মাটি একটি গণঅভ্যুত্থানের প্রসব বেদনায় উদ্বেল হয়ে উঠেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সম্ভাবনা কতটুকু?

আমার দৃঢ় বিশ্বাস এবং আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে বলছি, এই সরকারের বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠেছে। একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে তারা শেষ রক্ষার চেষ্টা করলেও তা শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে তা অনিশ্চিত। নির্বাচন তাদের দিতেই হবে। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হবে কিনা বলা যায় না। সার্বিক বিবেচনায় জাতীয় সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি মনে হচ্ছে।

জাতীয় সরকারের মাধ্যমে রাজনৈতিক ঐক্য আসবে কী?

আমি মনে করি, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি জাতীয় সরকার হতে পারে। এবং সেই জাতীয় সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে।

ড. ইউনূসকে তো আওয়ামী লীগ গ্রহণ করবে না। সেক্ষেত্রে?

এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে বাংলাদেশে একমাত্র ড. মুহম্মদ ইউনূসই নোবেল বিজয়ী। দেশে-বিদেশের সর্বত্র তার গ্রহণযোগ্যতা ও জয়জয়কার।

সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন নয়।এমনকি সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারবেন না…

হাসানুল হক ইনুকে আমি একবার উপদেশ দিয়েছিলাম, ক্ষমতায় গেলে জিহ্বা সংযত রাখতে হয়। দেখা যাচ্ছে, সে শুধু আমার উপদেশকে অগ্রাহ্যই করেনি, বরং তার জিহ্বা দিন দিন লম্বা হচ্ছে। সরকার অনেক কিছুই করতে চায় কিন্তু সব তাদের ইচ্ছামত হয় না।

বিএনপি ও ২০ দলের ভাঙনের সম্ভাবনার কথা সরকারের লোকেরা বলছেন— কি মনে করেন?

২০ দলীয় নেত্রী ও বিএনপির নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও ২০ দলের ভাঙনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তা দিন দিন আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হবে। ভাঙনের আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই।

শরিকদের মধ্যে গুঞ্জন আছে, খালেদা জিয়াকে শাস্তি দিয়ে সরকার জেলে পাঠাবে। বি. চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন বিএনপি হবে। আপনি কি মনে করেন?

অধ্যাপক বি. চৌধুরীকে আমি ৩০ বছর যাবত চিনি। তিনি আমার অগ্রজ। আমার নিকট অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি কখনও বিএনপি ভাঙার কথা চিন্তাও করবেন না। এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বরং বিএনপি যাতে আরও শক্তিশালী হয় সেদিকে তিনি চিন্তা করেন।

২০ দল ও বিএনপিতে জামায়াত নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে কিনা?

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু এটি ভাঙনের দিকে যাবে না। এই মতপার্থক্য বিএনপি বা ২০ দলের মধ্যে সঙ্কট সৃষ্টি করবে না। আগামীতে ২০ দলে আরও চমক আছে…।

তাহলে কী ২০ দল সম্প্রসারিত হচ্ছে?

শনিবার আমাদের দলের ইফতার পার্টিতে খালেদা জিয়া সকলের উদ্দেশে বলেছেন, আসুন সকলে বসি। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। খালেদা জিয়া বলেছেন, আসুন এক সাথে বসি। কে ছোট, কে বড় সেটা দেখার সময় নেই। তার এ আহ্বান ও বক্তব্যে আমি অন্যান্য দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে একটি আন্তরিক সমর্থন লক্ষ্য করেছি। মোট কথা, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কোনো বিভাজন নয়, ঐক্যই হচ্ছে চূড়ান্ত লক্ষ্য।

এরশাদের জাপা থেকে আপনি নতুন জাপা গঠন করেছেন, এরশাদের জাপার ভবিষ্যত কী?

তাকেই জিজ্ঞাসা করুন। তিনি (এরশাদ) এখন কোনো আলো দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি (এরশাদ) বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পিতা বাংলাদেশ দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতন্ত্র দিয়েছেন। এখন আবার তিনি চোখে আলো দেখতে পাচ্ছেন না। যাই হোক, তবে এক সময়ে আমি তার সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলাম, তার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বহাল রয়েছে।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে রবিবার রাতে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে কী কথা হল?

অনেক কথাই হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে কথা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় মানুষ হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আমরা আশা করব, বাংলাদেশে যেখানে একটি অনির্বাচিত সরকার অধিষ্ঠিত, যেখানে গণতন্ত্র নির্বাসিত, যেখানে ক্ষমতাসীন দল নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়ে দেশকে পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, সেখানে গণতন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত নরেন্দ্র মোদি এই সফরের মাধ্যমে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের ব্যাপারে অবদান রাখবেন, এটা আশা করছি। বস্তুত নরেন্দ্র মোদি যেভাবে সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন, ১৫ মিনিট একান্তে কথা বলেছেন তা প্রশংসিত হয়েছে।

মোদি-খালেদা জিয়া বৈঠকের ফল কী?

গণঅভ্যুত্থানের চেষ্টা করা। সেখানে যাতে ভারত জনগণের পক্ষে থাকে। নরেন্দ্র মোদি কিংবা সোনিয়া গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, রাজিব গান্ধী এরা সবাই ভারতের স্বার্থ অবশ্যই দেখবে। কিন্তু ইন্দিরা কিংবা সোনিয়া গান্ধী যেভাবে বন্ধুত্বের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে রক্ষা বা তার ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা নিতো, এখন হয়তো মোদি সে প্রচেষ্টা নাও নিতে পারেন। কারণ, ওই ধরনের কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পর্ক মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার নেই।

তার মানে আপনারা কী দীর্ঘদিনের ভারতবিরোধী রাজনীতি থেকে সরে আসছেন?

ভারত বিরোধিতা আমাদের পার্ট নয়। আমরা কখনোই ভারতবিরোধী ছিলাম না। আমরা ভারতের সরকারের নীতির বিরুদ্ধে। আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন হয় নাই। আমরা ভারতের অন্ধ সমর্থক নই, বিরোধীও নই। ১৯৭১ সালে ভারতের জনগণ আমাদের পক্ষে ছিল, এবারও ভারতের জনগণের সমর্থন আমাদের প্রত্যাশা।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।