সঞ্চয়পত্র কেনার ধুম

ঢাকা : ব্যাংকের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার অনেক বেশি থাকায় আগে থেকেই এর বিক্রি বাড়ছিল। আর সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে_ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এমন বক্তব্যের কারণে গত কয়েকদিন ধরে সঞ্চয়পত্র কেনার ধুম পড়েছে। নতুন সুদহার কার্যকর হওয়ার আগে কিনলে বর্তমানের সুদহার অনুযায়ী মুনাফা পাবেন গ্রাহকরা। আর এ কারণেই এর বিক্রি বেড়েছে অনেক বেশি। তবে বিক্রির পরিমাণ মাস শেষে হিসাব হয় বলে এ মুহূর্তে বিক্রি বেড়ে যাওয়ার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
শুধু বিক্রি নয়, একই সঙ্গে বেড়েছে জমে থাকা সুদ উত্তোলন। সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও সুদ উত্তোলন এতটাই বেড়েছে যে, তা সামলাতে লোকবল বাড়িয়েও হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস। এ অফিসের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়ে থাকে। এর বাইরে ব্যাংকগুলোতেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানা গেছে।
ব্যাংকের সুদহার কমে আসার কারণে সঞ্চয়পত্রের সুদহার যে কমানো হবে, তা বেশ কিছু দিন আগে থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ বিভিন্ন সভা-সেমিনারে সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানোর ঈঙ্গিত দেন। এফবিসিসিআই ও এনটিভি আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় গত ৮ মে অর্থমন্ত্রী সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। গত ১০ মে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট অলোচনায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে সুদহার কমিয়ে ১১ দশমিক ২৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে সুদহার কমার প্রজ্ঞাপন এখনও জারি হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল সমকালকে বলেন, বিশ্বের কোনো দেশে সরকারি খাতে বিনিয়োগ করে এত উচ্চ সুদ পাওয়ার নজির নেই। সঞ্চয়পত্রে এত উচ্চ সুদ রেখে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো ও শেয়ারবাজার চাঙ্গা করা সম্ভব নয়। বিলম্বে হলেও সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক।
সরেজমিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে গিয়ে দেখা গেল, সঞ্চয়পত্র কেনা ও জমে থাকা সুদ উত্তোলনের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই ব্যাপক সঞ্চয়পত্র বিক্রি হলেও এত বেশি লাইন আর কখনও দেখা যায়নি। এতে করে সময়ক্ষেপণসহ নানা ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন তারা। এ ছাড়া সুদহার কমানোর সরকারি সিদ্ধান্তকে ঠিক নয় এমন মন্তব্যও করেছেন অনেকে।
ঢাকার ডেমরা অঞ্চলের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানার নামে ৫ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনতে এসেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে। নিজের নামে আগে কেনা আছে ১০ লাখ টাকার পেনশনার সঞ্চয়পত্র। জাহাঙ্গীর আলম জানান, অবসরে যাওয়ার পর থেকে অবসরকালীন ভাতা ও সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ থেকে আসা সুদ দিয়ে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া খরচ ও সংসার চলে। এখন সুদহার কমানোর যে ঘোষণা অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন, তা কার্যকরের আগেই নতুন করে পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে এসেছেন। প্রজ্ঞাপন জারির দিন বা পরবর্তী নির্দিষ্ট কোনো তারিখ থেকে নতুন সুদহার কার্যকর করা হতে পারে_ এমন ধারণা থেকে তিনি তার স্ত্রীর নামে পাঁচ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র আগে থেকেই কিনছেন ।
পাঁচ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র কেনা আছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রাশেদা সুলতানার। প্রতি মাসে সুদ উত্তোলনের সুযোগ থাকলেও গত ছয় মাস ধরে তিনি তোলেননি। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে এসেছেন একসঙ্গে ছয় মাসের সুদ উত্তোলনের জন্য। কারণ হিসেবে জানান, সুদহার কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এজন্য জমে থাকা সুদ তুলতে এসেছেন। বেসরকারি চাকুরে বোরহান উদ্দিনের তিন মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনা আছে। প্রতি তিন মাস পর সুদ উত্তোলনের সুযোগ থাকলেও তিনি গত ছয় মাসে সুদ নেননি। সুদ কমানোর বিষয়টি কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা তার কাছে পরিষ্কার না থাকায় গতকাল এসেছেন দুই কিস্তির সুদ উত্তোলনের জন্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের সঞ্চয়পত্র শাখার উপপরিচালক আ ক ম সেলিম জানান, গত কয়েকদিন সঞ্চয়পত্র বিক্রি অনেক বেড়েছে। প্রস্তুতি না থাকায় সেবা দিতে প্রথম দু-এক দিন তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। পরে লোকবল বাড়িয়ে এ ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে চাপ অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় একটু বেশি থাকায় গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
২০১২ সালের ১ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদহার আর কমায়নি সরকার। বর্তমানে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ সুদ দেওয়া হয়। বেশি সুদের কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এ সময়ে আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের আসল হিসেবে ৯ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা পরিশোধের পর নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আশানুরূপ বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো বেশ আগ থেকেই সুদহার কমিয়ে আসছে। গত মার্চের হিসাবে ব্যাংকগুলোর আমানতে গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।