৩ বছরে প্রবাসে ৩৩১ নারী শ্রমিকের মৃত্যু

3

চুয়াডাঙ্গার মর্জিনা বেগম (৪৫)। অভাবের সংসারে স্বামী আর সন্তানদের একটু সুখে রাখতে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। তখন তার এক সন্তান পড়াশোনা করছিলেন ডিপ্লোমাতে আরেক সন্তান হাইস্কুলে। কৃষক স্বামীর একা উপার্জনে পুরো পরিবারটি হিমশিম খাচ্ছিল। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে ২০১৭ সালে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। কিন্তু সৌদি আরব যাওয়ার এক বছর পরই তিনি আত্মহত্যা করেন। পরিবার জানে না কি কারণে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। ডিপ্লোমা শেষ করা তার ছেলে আবু মুসা বলেন, কি কারণে আত্মহত্যা করেছে আমরা কিছুই জানি না। আত্মহত্যার দুই দিন আগেও আমাদের সবার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। হাসিখুশি কথা বলেছি। কিন্তু কি হতে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। তবে শুনেছি ওখানে আম্মুর ওপর নির্যাতন করেছে। আম্মু মরে যাওয়ার পরে ছোট ভাইটার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সে বাবার সঙ্গে কৃষি কাজ করে, আমার এখনো কিছু হয়নি। 

যশোরের অভয়নগরের জেসমিন। তিনিও স্বপ্ন দেখে একই বছর পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। গত বছরের ২৯শে ডিসেম্বর খবর আসে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তার ছেলে মাহতাব গাজী বলেন, মা খাবার আর ওষুধ নিয়ে সমস্যা হতো বলে প্রায়সময় বলতো। দেশ থেকে যেগুলো ওষুধ নিয়ে গেল সেগুলো খেতে দিতো না। সবশেষ যখন কথা হয় তখন বললাম, আমি নামাজ পড়ে তোমার জন্য দোয়া করবো মা। মা আমাকে বলেন, কি দোয়া করিস, আমার কোনো কাজে লাগে না। জাতীয় নির্বাচনের দুই দিন আগে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে আমাকে জানায় আমার মা আত্মহত্যা করেছে। কি কারণে আত্মহত্যা করলো এখনো জানি না। কিন্তু মা যে কষ্টে ছিল তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

শুধু মর্জিনা বা জেসমিন নয় বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ গৃহকর্মী মধ্যপ্রাচ্যে ভিড় করছে স্বপ্ন পূরণের আশায়। কিন্তু অনেকে ফিরছে লাশ হয়ে। বা লাশ হয়ে না ফিরলেও নানান রকম অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে তাদের। এমন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে যখন নারী শ্রমিকরা আত্মহত্যা করে বা কোনোভাবে মারা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে তাদের লাশও নিতে চান না পরিবার। সংশিষ্ট সূত্র জানায়, অনেক পরিবারের সদস্যরা লাশ ফেরত নিতে চান না, বিদেশ থেকে লাশ আনার জন্য আবেদনও করেন না। ফলে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে ঠিক কতজন মারা যায় বা আত্মহত্যা করে তার সঠিক হিসাব জানা যায় না।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের হিসাব অনুযায়ী বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক বলছে, বিদেশে কাজ করতে গিয়ে গত তিন বছরে ৩৩১ জন নারী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত গত ছয় মাসে ৬০ নারী শ্রমিকের মৃতদেহ দেশে এসেছে। নারী গৃহকর্মীর মৃতদেহের মধ্যে সৌদি-২৬, জর্ডান ৯, লেবানন ৯, আরব আমিরাত ৪, ওমান ৩ ও বিভিন্ন দেশ থেকে আরো ৯ নারীর মৃতদেহ দেশে ফিরেছে। এদের মধ্যে আত্মহত্যাজনিত ১৭, স্ট্রোক ২০, দুর্ঘটনায় ১০, স্বাভাবিক ৫ আর অন্যান্য কারণে আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে সৌদি আরবে ১০ নারী আত্মহত্যা করেন বলে জানা গেছে। এর আগে ২০১৬ সালে ৫৭ জন, ২০১৭ সালে ১০২ এবং ২০১৮ সালে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত নারীকর্মীদের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন। এ ছাড়া স্ট্রোকের কারণে মৃত্যু হয়েছে ১১০ জন নারী কর্মীর। ফেরত আসা লাশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে সৌদি আরব থেকে যার সংখ্যা ১১২। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২৬, ওমান থেকে ৩৪, লেবানন থেকে ৪২ এবং জর্ডান থেকে ৬২টি নারীকর্মীর লাশ এসেছে দেশে।

গত দুই যুগ ধরে বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ। জানা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গত ২৭ বছরে ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৫ জন নারী শ্রমিক গেছেন প্রবাসে। শুধু তাই নয় এতকিছুর পরেও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নারী শ্রমিক পাড়ি জমিয়েছে ৬৮ হাজার ৯৩৮জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন ৪৪ হাজার ২ জন। বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের মধ্যে সৌদি আরবেই বেশি পাড়ি জমান। যার সংখ্যা এই পর্যন্ত ২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৪২ জন। চলতি বছর সৌদি আরবের পর ওমানের দিকে ঝুঁকছে নারী শ্রমিকরা। গত ছয় মাসে জুন পর্যন্ত এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ২৬৩ জনে।
প্রবাস ফেরত নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে নারী কর্মীদের শরীরে ক্ষত ও দুর্বিষহ জীবনের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বেশি। কাজের বেতন দিয়ে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন যখন গৃহকর্তার যৌনলালসার কবলে পড়ে তখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় তাদের জীবন। তখন পরিবারেও ঠাঁই হয় না তাদের। ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব ফিরে আসা নারী কর্মীরা বলছেন, বিদেশের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে কোনো নারী আর প্রবাস জীবনের রঙিন স্বপ্ন দেখতে চায় না। অপ্রত্যাশিত গর্ভবতী হয়ে পড়া ও মাত্রাতিরিক্ত নির্যাতনে জীবনের প্রতি তিক্ততা সৃষ্টি হওয়ার কারণে বহু নারী গৃহকর্মী আত্মহত্যার মতো কঠিন পথও বেছে নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার ফলেও অনেকের স্ট্রোকজনিত কারণে মৃত্যু হচ্ছে।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা বেশির ভাগই অদক্ষ। বিদেশি ভাষার দুর্বলতা, কাজ না জানাসহ এসব কারণে নানান পরিস্থিতিতে তাদের পড়তে হয়।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, নারী কর্মীদের আত্মহত্যার পেছনে নির্যাতন একটি কারণ হতে পারে। হয়তো এমন কোনো পরিস্থিতিতে তিনি পড়েছিলেন যে তার ধারণা এরপর আর বেঁচে থেকে লাভ নেই। কারণ হয়তো সেই পরিস্থিতি তিনি মেনে নিতে পারেননি।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, একজন মানুষ যখন আত্মহত্যা করে, তখন বুঝতে হবে তিনি আর নির্যাতন সহ্য করতে পারছে না। সবাই স্বপ্ন নিয়েই যায়, কেউ আত্মহত্যা করতে চায় না। সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের উচিত নিয়মিত বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেয়া। এসব বিষয় নিশ্চিত না করে গৃহকর্মী পাঠানো ঠিক হবে না আমি মনে করি।

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, গতকালও এক মেয়ে নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র দিয়েছে আমার কাছে। নারী শ্রমিকরা কেন মারা যাচ্ছে তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কর্মস্থলে জেন্ডার বেস ভায়োলেশন বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকের ওপর কোনো নির্যাতন করা যাবে না। নিয়মতি মনিটরিং করতে হবে। বিদেশে সেবার পরিমাণ ও মান বাড়াতে হবে। তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করলেই মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমে যাবে।

 

সুত্র : mzamin.com