স্বর্ণ চোরাচালানে ২৫ সিন্ডিকেট

0

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের পেছনে সক্রিয় রয়েছে ২৫টি সিন্ডিকেট। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে স্বর্ণ আনছে তারা। বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সেক্টরের আড়াইশ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী এ কাজে তাদের সহায়তা করছেন। এমন অভিযোগ ওঠার পর তাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্বর্ণ চোরাচালানে অভিযুক্ত পঞ্চাশ জন এর মধ্যেই পালিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছেন। বাইরে থাকলেও বিভিন্ন মাধ্যমে চোরাচালান সিন্ডিকেটে ভূমিকা রাখছেন তারা। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বর্ণ চোরাচালান সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এরপর সেখান থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানে ১৮টি, শাহ আমানতে পাঁচটি ও ওসমানী বিমানবন্দরে দুটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিমানবন্দর ও বিমানে কর্মরত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে তারা চোরাচালান করছেন। এসব অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রয়েছেন বিমান বাংলাদেশের কয়েকজন পাইলট, কো-পাইলট, কেবিন ত্রুক্র, ফ্লাইট স্টুয়ার্ট, চিফ পার্সার, জুনিয়র পার্সার ছাড়াও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রতি দশ তোলা স্বর্ণ বিমানবন্দরের ভেতর থেকে বাইরে আনতে জনপ্রতি দেওয়া হচ্ছে দেড় হাজার টাকা।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় চোরাচালান প্রতিরোধ-সংক্রান্ত কমিটির সভায়ও সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান বন্ধ ও বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট সম্পর্কে আলোচনা হয়। সিন্ডিকেটে সম্পৃক্ত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘দেশের বাইরে থেকে কিছু ব্যক্তি স্বর্ণ চোরাচালান করছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখছে। যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দারা চোরাচালানিদের নজরদারিতে রেখেছে। বিশেষ সতর্কতার কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও কাস্টমস বিভাগের গোয়েন্দাদের কাছেও বারবার চোরাচালানের স্বর্ণ ধরা পড়ছে। এতে চোরাচালানিও অনেক কমে গেছে।’

প্রতিবেশী দেশের চাহিদা মেটাতে চোরাচালান :স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রতিবেশী একটি দেশের স্বর্ণালঙ্কারের চাহিদা মেটাতে স্বর্ণের বার দুবাই, মালয়েশিয়া, ওমান, সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে আনা হয়। এসব বার পরে বেনাপোল স্থলবন্দর ও ভোমরা স্থলসীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয়। এসব স্বর্ণের মধ্যে খুব সামান্যই ধরা পড়ে। চোরাচালান চক্রগুলোর মধ্যে দেশে অবস্থান করা চক্রগুলো সরাসরি জড়িত থেকে মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে, মানি চেঞ্জারের ব্যবসার আড়ালেও স্বর্ণ চোরচালান করছে। গত বছর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আত্মীয় মাহমুদুল হক ওরফে পলাশ, বিমানের চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড সিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ, ফ্লাইট সার্ভিস শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদ হোসেন ও ব্যবস্থাপক (সিডিউলিং) তোজাম্মেল হোসেন এবং মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ গ্রেফতার হন। এ ঘটনার পর দেশ থেকে পালিয়ে যান বিমানের ডেপুটি চিফ অব ট্রেনিং শামীম নজরুল। তাদের অনেকই আইনের মারপ্যাঁচে ছাড়া পেয়েছেন। অনেকে বিদেশে পালিয়ে আছেন।

বাটোয়ারা দ্বন্দ্বে স্বর্ণ ধরা পড়ে :গত বছর প্রত্যেক মাসেই স্বর্ণের ৫-৬টি অবৈধ চালান ধরা পড়েছে। এ বছর চোরাকারবারিরা কৌশল পরিবর্তন করায় তা কমে গেছে। এরপরও চলতি বছর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বড় ধরনের কয়েকটি চালান ধরা পড়ে। গোয়েন্দা তথ্যমতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বর্ণ চোরাচালান ধরা পড়ে বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তি ও পাচারকারীদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে।

গত পহেলা নভেম্বর রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো ফ্লাইট এসকিউ-৪৪৬ অবতরণ করলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ১৪ কেজি স্বর্ণ জব্দ করে ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেনটিভ টিম। এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি দোহা থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করা বাংলাদেশ বিমানের (বিজি ০২৬) ফ্লাইটে অভিযান চালিয়ে বিমানের সিটের নিচ থেকে ছয় কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এই চক্রের সদস্যদের অনেকেই মানিচেঞ্জারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালান করছেন তারা। বিভিন্ন পর্যায়ের ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তাদের বিশেষ সখ্য রয়েছে। তাদের অধিকাংশের বাড়িই বৃহত্তর চট্টগ্রামে। তারা কেউ কেউ জুয়েলারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, স্বর্ণ চোরাচালানে গ্রেফতার ব্যক্তিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে জড়িত মূলহোতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। বিমানবন্দরে দায়িত্বরত সকল সংস্থার সদস্যদের নির্ধারিত সময়ের পর গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে অর্থ-সম্পদের বিবরণসহ নিরাপত্তা বিষয়ক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

চোরাচালানে যুক্ত দুটি চক্র :ঢাকা কাস্টম হাউসের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ‘স্বর্ণ চোরাচালানে দুটি চক্র জড়িত। একটি চক্র বিদেশ থেকে প্যাকেটভর্তি একটি একশ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ বিমানের কোনো যাত্রীর হাতে ধরিয়ে দেয়। আরেকটি চক্র শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষা করে। চুক্তি অনুযায়ী একশ’ গ্রাম স্বর্ণের প্যাকেটটি এ চক্রের সদস্যরাই সংগ্রহ করে। প্রতিটি একশ’ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ বহনের জন্য যাত্রীদের দেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা করে।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপটেন (অব.) এএম মোসাদ্দেক আহমেদ সমকালকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতীতেও সে ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। অন্যায় করে কেউ পার পাবে না।’

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান সমকালকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অসাধু কর্মীসহ একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি বিমানের বডি থেকে দেড় মণ চোরাই স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় উপমহাব্যবস্থাপকসহ একাধিক ব্যক্তি আটক হন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

শাহজালালে প্রতিদিন ১০ কেজি স্বর্ণ :শুল্ক গোয়েন্দা, বিমান ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রতিদিন সিঙ্গাপুর থেকে চারটি, মালয়েশিয়া থেকে চারটি, দুবাই থেকে পাঁচটি, সৌদি আরব থেকে তিনটি ফ্লাইট শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রতিটি ফ্লাইটে যাত্রী থাকেন ৪০০ থেকে ৪৫০ জন। সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের অন্তত ৪০ জনের কাছে ১০০ গ্রাম ওজনের মোট চার কেজি স্বর্ণ থাকে। এভাবে প্রতিদিন সিঙ্গাপুর থেকে আসা চারটি ফ্লাইটের যাত্রীদের মাধ্যমে দেশে ১৬ কেজি স্বর্ণ আসে। একই কায়দায় মালয়েশিয়া থেকে আসা বিমানের ১০ শতাংশ যাত্রীর মাধ্যমে প্রায় আট কেজি স্বর্ণ আসছে। আবার দুবাই থেকে আসা বিমানের মোট যাত্রীর মধ্যে পাঁচ শতাংশের হাত দিয়ে বৈধভাবে দুই কেজি স্বর্ণ আসে। এভাবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই দুবাই থেকে প্রতিদিন অন্তত পাঁচটি ফ্লাইটে ১০ কেজি স্বর্ণ দেশে প্রবেশ করে। মোট যাত্রীর পাঁচ শতাংশ স্বর্ণ বহন করেন। তিনটি বিমানবন্দরের চিত্রই এরকম বলে জানা গেছে।

সূত্র সমকাল ২৬-১১-১৬