সৌদিতে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধের দাবি

3
সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে একের পর এক গৃহকর্মীর ফিরে আসার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে আর নারী শ্রমিক না পাঠানোর দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনে কয়েক সংসদ সদস্য এ দাবি তোলার পর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারও চিন্তিত। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো শুরু করার পর থেকে সে দেশ থেকে নানা ধরনের নির্যাতনের খবর আসতে থাকে। এ বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৮৫০ নারী দেশে ফিরে আসার পর তাদের মুখে সেখানে যৌন নিপীড়নসহ নানা ধরনের নির্যাতনের খবর গণমাধ্যমে আসার পর বিভিন্ন নারী সংগঠন সৌদি আরবে আর নারীকর্মী না পাঠানোর দাবি তোলে। এই পরিস্থিতিতে গতকাল বিষয়টি আলোচনায় তোলেন জাতীয় পার্টির সাংসদ মুজিবুল হক চুন্নু।

তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের ওপর নানা ধরনের অত্যাচার ও যৌন নির্যাতন করা হয়।’ এ সময় নারীকর্মীদের যৌন নির্যাতন বন্ধ করে চাকরিসহ বেতন নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান তিনি। জবাবে ইমরান আহমেদ বলেন, ‘গৃহকর্মীর বিষয়ে আপনারা যতটা চিন্তিত তার থেকে বেশি সরকার চিন্তিত। সৌদি আরবে আমাদের যে রাষ্ট্রদূত রয়েছে তাকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ওই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এগুলো তোলার জন্য।’ এরপর সংসদে বিষয়টি নিয়ে একের পর এক প্রশ্নের কবলে পড়েন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ।

তিনি বলেন, ‘বলা হচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশে কর্মী পাঠায়। তাহলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বটা কী? মা-বোনদের আমরা পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওইখান থেকে যৌন নির্যাতনসহ নানা রকম অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়ে অবশেষে লাশ হয়ে ফিরে আসে। এদের সবারই পোস্টমর্টেমে লেখা থাকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’। সবারই একই রকম রিপোর্ট। এটা তারা (সৌদি আরব) করে। ওখানে পোস্টমর্টেম যে হয়, সেটাও বাংলাদেশ দূতাবাস দেখে না। মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নেয় না। স্পষ্টভাবে জানতে চাই, এটা অবিলম্বে বন্ধ হবে কি না? মা-বোনদের পাঠিয়ে দেশ বিক্রির টাকা আমাদের দরকার নেই। বন্ধ করবেন কি না?’

জবাবে ইমরান আহমদ বলেন, ‘আমরা জিরো টলারেন্সে আছি। আমরা আইন করে দিচ্ছি। যারা বিদেশ পাঠাবে সৌদি আরবে ওদের কাউন্টার পার্ট রিক্রুটিং এজেন্সির সম্পূর্ণ ডিটেইলস আমাদের দিতে হবে। যাতে সৌদি আরবকেও আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বলতে পারি।’ সৌদি আরবে নারী শ্রমিকদের পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর জোর দেন বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী। তার মতে, এটাও সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার একটি কারণ। এজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

গণফোরামের সাংসদ সুলতান মনসুর আহমেদ বলেন, নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেশি করে পুরুষ শ্রমিক পাঠানো হোক। জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের চেষ্টা থাকবে মহিলারা যেন সম্মানজনকভাবে চাকরি করতে পারেন। আর একেবারেই যদি সম্ভব না হয় তাহলে আমরা না পাঠানোর চিন্তা করব।’ সংরক্ষিত আসনের বেগম ওয়াসিকা আয়শা খানের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ১৯৯১ সাল থেকে বিদেশে নারীকর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত ৭৪টি দেশে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬৩ নারীকর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন ৩ লাখ ৩০ হাজার ৫৯০ জন। এ ছাড়া জর্ডানে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৯১ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ লাখ ২৬ হাজার ১৪৩ জন, লেবাননে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৪৪ জন, ওমানে ৮৫ হাজার ৯১৪ জন, কাতারে ৩২ হাজার ২৮০ জন, মরিশাসে ১৮ হাজার ৩৩১ নারীকর্মী পাঠানো হয়। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স উল্লেখ করে বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থেই বিদেশে শ্রমিক পাঠানো হয়। নারী শ্রমিকদের বিদেশে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে আসার এই সমস্যা ঠেকাতে সংসদ সদস্যরা কোনো পরামর্শ দিলে সরকার তা গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।