শারাপোভার অজানা

23
Russia's Maria Sharapova reacts after beating US player Coco Vandeweghe during their women's quarter-finals match on day eight of the 2015 Wimbledon Championships at The All England Tennis Club in Wimbledon, southwest London, on July 7, 2015. Sharapova won the match 6-3, 6-7, 6-2. RESTRICTED TO EDITORIAL USE -- AFP PHOTO / JUSTIN TALLISJUSTIN TALLIS/AFP/Getty Images

স্পোটর্স ডেস্ক : মারিয়া শারাপোভা একটি নাম একটি সেনসেশন। যেমন দেখায়, তেমন খেলায়। উইলিয়ামস বোনদের যুগেও নিজের ইমেজ বেশ ভালভাবেই ধরে রেখেছেন এই রুশ কন্যা। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি যার উচ্চতা তাকে দেখতে তো রাস্তায় ভিড় জমবেই। না, ২৮ বছর বয়সী শারাপোভা কেবল চেহারার সৌন্দর্যে বিশ্বাসী নন। এ সৌন্দর্য তো বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কমবেই, ঠেকানোর উপায় নেই। মাঠের নৈপুণ্যটাই মানুষের মনের পটে চিরভাস্বর থাকবে। রেকর্ডের পাতাতে থাকবে আরও বেশি দিন। আনা কুর্নিকোভার কথা মনে আছে? অনেকের হয়তো আছে।গত অর্ধশতকে টেনিস মাঠে তার চেয়ে বড় আকর্ষণীয় তারকা বোধহয় ছিলেন না। কিন্তু সময়ের ফেরে হারিয়ে গেছেন তিনি। যতদিন যৌবন ছিল ততদিন আকর্ষণও ছিল। এরপর আর তাকে ঘিরে মনে করার মতো কিছু পাবেন না। প্রথমদিকে শারাপোভাকে সবাই তুলনা করতেন কুর্নিকোভার সঙ্গে। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের আভায় উদ্ভাসিত শারাপোভা। তার চেয়ে সবদিকেই তিনি অনেক এগিয়ে। দুটি গ্র্যান্ডসøামও জিতেছেন। ২০০৪ সালের গ্রীষ্মে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি উইম্বলডন শিরোপা জয় করেন। তিনিই প্রথম রাশিয়ান যিনি এ শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। এজন্য শারাপোভা বলেন, ‘আমি কারও কাছাকাছি নই। আমিই প্রথম শারাপোভা।’ খেলার মাঠে তার সাফল্য সহজে মুছে ফেলার নয়। আয়েও পিছিয়ে নেই। হালে বিশ্বে তিনিই মহিলা খেলোয়াড়দের মধ্যে সবার ওপরে। একদিনে বা এক বছরে এ অর্জন সম্ভব হয়নি। এর পেছনেও আছে ছোটখাটো এক ইতিহাস।
যেভাবে শুরু পথচলা
শারাপোভার শৈশবটা খুব চাকচিক্যে ভরা ছিল না। ১৯৮৭ সালের ১৯শে এপ্রিল সাইবেরিয়ার নিয়াগান অঞ্চলে জন্ম মারিয়া শারাপোভার। পুরো নাম মারিয়া ইউরিয়েভনা শারাপোভা। পিতার নাম ইউরি আর মায়ের নাম ইয়েলেনা। এরা কেউ বড়মাপের খেলোয়াড় ছিলেন না। তবে দুজনই খেলার প্রতি দারুণ আগ্রহী ছিলেন। ইউরি কাজ করতেন একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে। ইউক্রেনের একটি শহর গোমেলে তাদের দুজনের পরিচয়। এরপর তাদের পরিণয়। ১৯৮৬ সারের এপ্রিলে যখন চেরনোবিলে ইতিহাসের ভয়াবহতম পরমাণু বিস্ফোরণে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে তখন ইয়েলেনা গর্ভবতী। পরে অনাগত শিশুকে তেজস্ক্রিয়তা থেকে বাঁচাতে চার মাস পর পরিবার নিয়ে সাইবেরিয়ার নিয়াগানে পাড়ি জমান ইউরি। এখানেই জন্ম শারাপোভার। এরপর কয়েকটি বছর তাদের কাটে সাইবেরিয়ার নানা এলাকায় ঘুরেফিরে। তেলের খনিতে কাজ পান ইউরি। তবে অত্যধিক ঠা-ায় কাবু হয়ে যাচ্ছিলেন তারা। চার বছর কিছু কিছু সঞ্চয় করে পরিবার নিয়ে ইউরি পাড়ি জমান রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে কৃষ্ণসাগরের পাড়ে অন্যতম সেরা অবকাশ নগরী সোচিতে।
শারাপোভার বাবা-মার টেনিসের প্রতি একটা বাড়তি আকর্ষণ ছিল। তারা টেনিস র‌্যাকেট কিনে দিলেন হাঁটি হাঁটি পা পা করা মেয়েকে। কিভাবে বল মারতে হয় শেখাতে লাগলেন। শারাপোভা যাতে ভালভাবে ধরতে পারে এজন্য র‌্যাকেটের হাতল কেটে ছোট করে দেন তারা। টেনিস র‌্যাকেট নাড়াচাড়া করতে করতে দেখা গেল খুব দ্রুতই শিখছে মেয়েটি। এতে বাবা-মার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। যখন তার বয়স সবে মাত্র ছয় বছর তখন মস্কোতে এক টেনিস ক্লিনিকে সুযোগ পান। সেখানেই তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা মার্টিনা নাভ্রাতিলোভার নজরে পড়েন। নয়বারের উইম্বলডন জয়ী নাভ্রাতিলোভা শারাপোভার খেলা দেখে মুগ্ধ হন। তিনি শারাপোভার পিতাকে পরামর্শ দেন মেয়েকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিক বলটিয়েরির টেনিস একাডেমিতে পাঠানোর জন্য। এ একাডেমিতে বিশেষভাবে টেনিসের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অনেক বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় এ একাডেমি থেকে বিশ্ব কাঁপিয়েছেন। এদের মধ্যে পিট সাম্প্রাস, আন্দ্রে আগাসি, মনিকা সেলেস অন্যতম।
ইউরি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন সবাই মিলেই পাড়ি জমাবেন যুক্তরাষ্ট্রে। রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা তখন ভাল না। কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের পর সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ভেঙে যাওয়ায় দেশটিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোই দায় হয়ে পড়েছিল। ডলারের তুলনায় রুবলের দাম অনেক পড়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা জোগাড় করতে সক্ষম হন তার পিতা ইউরি। কিন্তু বাবা আর মেয়ের ভিসা মেলে। ইয়েলেনার ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তিনি দেশেই থেকে যান। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এবং একাডেমিতে ভর্তির জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজন ছিল, যা জোগাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন ইউরি। পরে ইউরি ও ইয়েলেনা তাদের পিতামাতার কাছ থেকেও অর্থ ধার করেন কেবল মেয়েকেই টেনিস শেখানোর স্বপ্ন পূরণে।
এত অল্প বয়সে মাকে বিদায় জানানোর সময়টি বেশ আবেগঘন ছিল। তবুও শারাপোভা লক্ষ্য অবিচল। এক সাক্ষাৎকারে শারাপোভা বলেন, মনে আছে ব্যাগ গোছানোর সময় আমি কেবল আমার কিছু বই সঙ্গে নিয়েছিলাম। মাকে বলেছিলাম, আমি নিশ্চিত করতে চাই আমার সঙ্গে দেশের কিছু জিনিস আছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন
১৯৯৪ সালের কোন এক শুভক্ষণে বাবা-মেয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। দুই দেশে একটি পরিবারের দুটি নতুন জীবন শুরু হয়। শারাপোভার বয়স তখন সবে সাত। প্রবাস জীবন যতটা সহজ মনে হয় বাস্তবতা তত সহজ হয় না। নতুন ও অপরিচিত এক পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলার পাশাপাশি অর্থ জোগাতেও হিমশিম খেতে হয়। মেয়েকে একাডেমিতে ভর্তি করাতে গিয়ে দেখেন সেখানে কেবল তাদেরই ভর্তি করানো হয় যাদের তারা নিজেরা আমন্ত্রণ জানান। তাছাড়া এই মেয়ে বয়সেও অনেক ছোট। মহাচিন্তায় পড়লেন ইউরি। কিন্তু দমবার পাত্র নন তিনি। যেভাবেই হোক লক্ষ্য তার পূরণ করতেই হবে। ফ্লোরিডাতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। মেয়ের জন্য একজন কোচও নিয়োগ করলেন। অর্থের জোগাড়ে তিন চার রকমের কাজ করতে হতো শারাপোভার বাবাকে। তিনি কখনও দোকানের বিক্রয়কর্মী, কখনও হোটেলের ওয়েটার আবার কখনও পরিচ্ছন্নকর্মীর কাজও করেছেন। ইউরি এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে, শারাপোভা সেই দিনগুলোর একাকিত্বের কথা এখনও স্মরণ করেন। বলেন, দিনের বেলায় আমাদের খুব কমই দেখা হতো। আমাকে অনেকটা সময় একাকীই কাটাতে হতো। জানতাম আমি আর সুযোগ পাবো না। যা করার এভাবেই করতে হবে।’ সবাই তাকে কুর্নিকোভার সঙ্গে তুলনা করায় তার ভেতরে আরও জেদ চেপে বসে। তাকে আনার চেয়েও ভাল কিছু করতে হবে। অবিচল লক্ষ্যে নিষ্ঠা আর একাগ্রতা থাকলে তা অর্জন হবেইÑ এ বিশ্বাস ছিল বাবা ও মেয়ে দুজনেরই। মাত্র চার মাসের মধ্যে ইংরেজি শিখে ফেলেন শারাপোভা। ততদিনে টেনিসে তার দক্ষতা বেড়েছে অনেক। যেমন সার্ভের কৌশল তেমন লাইন থেকে বল ফেরানো। সবই দুর্দান্ত। দুই বছর পর যখন শারাপোভার বয়স ৯ তখন ইউরি মেয়েকে নিয়ে ফের বলেটিয়েরি একাডেমির দরজায় পা রাখেন। এবার আর তাকে ফেরাতে পারলো না একাডেমি কর্তৃপক্ষ। তারা এই খুদে বালিকার নৈপুণ্যে অবাক। এতটাই মুগ্ধ তারা যে, বছরের ট্রেনিং, টিউশন ও অ্যাকমোডেশন ফি বাবদ ৪৬০০০ ডলারের পুরোটাই মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ একাডেমিটি ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের  (আইএমজি) অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। এরা বিনোদন ও খেলাধুলার জগতের মেধাবীদের নিয়ে কাজ করে এবং বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিভা বাছাই করেও নিয়ে আসে এখানে। তারা শারাপোভার মধ্যে ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল তারকার চিহ্ন দেখতে পেয়েছিল বলেই বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিল। অর্জনের ষোলকলা পূর্ণ হয় ঠিক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ শারাপোভার মায়েরও ভিসার অনুমোদন দেয়। দুই বছরের বিচ্ছেদ কাটিয়ে আবার একত্রিত হয়ে জীবন শুরু করেন ইউরি-ইয়েলেনা ও শারাপোভা। তবে অল্প দিনের মধ্যে শারাপোভাকে একাডেমির হোস্টেলে উঠতে হয়। পরে শারাপোভার অনেক সাক্ষাৎকারে পাওয়া যায় একাডেমির জীবন কতটা কঠোর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। অনেক সময় তিনি জ্যেষ্ঠ মেয়েদের নিপীড়নেরও শিকার হতেন। তারা হিংসা করত শারাপোভাকে। সেখানে নিয়মিত শ্রেণীতে পাঠ নেয়ার পাশাপাশি ছিল টেনিস কোর্টে ছয় ঘণ্টার অনুশীলন। কিশোরী মাঝে মধ্যেই ভেঙে পড়তে চাইতো।
সাফল্যের সোপানে
১১ বছর বয়সে শারাপোভার নতুন কোচ নিয়োগ দেয়া হয় রবার্ট ল্যান্সড্রপকে। এ কোচের শিষ্য ছিলেন পিট সাম্প্রাস, ট্রেসি অস্টিন (দুবার ইউএস ওপেন জয়ী), লিন্ডসে ডেভেনপোর্টের (তিনটি গ্র্যান্ডসøাম জয়ী) মতো খ্যাতনামা তারকারা। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি আইএমজির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন, যার সুবাদে বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী এবং জুতা ও কাপড় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নাইকির সঙ্গে প্রথম চুক্তি হয় তার। ১৩ বছরে প্রথম জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন শারাপোভা। দুই বছর পর তিনি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে জুনিয়র বিভাগের ফাইনালেও ওঠেন। ১৪ বছর বয়সেই পেশাদার জগতে পা রাখেন। ২০০৩-এ মহিলা টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউটিএ) প্রথম শিরোপা জেতেন এআইজি জাপান ওপেনে। একই বছর উইম্বলডন ওপেনে প্রথমবারের অংশ নেন এবং চতুর্থ রাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছান। কে জানতো পরের বছর তিনিই হবেন এই অভিজাত শিরোপার বিজয়িনী। দুর্দান্ত প্রতাপশালী সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। বিস্ময়ভরা চোখে তার খেলা দেখেন বিশ্বের কোটি কোটি টেনিসপ্রেমী। তিনি হলেন উইম্বলডনে তৃতীয় কমবয়সী মহিলা চ্যাম্পিয়ন। ১৯৭৪-এর পর কোন রাশিয়ান এই প্রথম ফাইনালে খেলেন আর প্রথম রাশিয়ান হিসেবে তিনিই এখন পর্যন্ত একমাত্র উইম্বলডন জয়ী। উইম্বলডন হলো বিশ্বের অন্যতম সেরা অভিজাত আসর। লন্ডনের এক প্রান্তে উইম্বলডন এলাকায় অবস্থিত অল ইংল্যান্ড লন টেনিস এবং ক্রোকেট ক্লাবের এ প্রতিযোগিতার শুরু সেই ১৮৭৭ সালে। এক সময় এ আসরে মেন’স সিঙ্গেলসকে বলা হতো জেন্টেলমেন’স সিঙ্গেলস। ১৮৮৪ সালে প্রথম লেডি’স সিঙ্গেলস শুরু হয় যা পরে ওমেন’স সিঙ্গেলস নামকরণ হয়। ২০০৫-এর শেষে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে তিনি চলে আসেন চার নম্বরে এবং ২০০৬-এ জেতেন ইউএস ওপেন শিরোপা।
ফ্লোরিডাতেই নতুন আবাস
যে ফ্লোরিডা তাকে দিয়েছে নতুন জীবন, দিয়েছে খ্যাতি, অর্থবিত্ত, সেখানেই স্থায়ী আবাস গাড়েন এই রুশ কন্যা। ২০০৫-এ তার ১৮তম জন্মদিনে নিউ ইয়র্ক সিটির হিরো নামের নাইট ক্লাবে আয়োজন করা হয় এক অনুষ্ঠানের। এর আযোজক ছিল মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মোটরোলা। আগের বছরের উইম্বলডন জয়ের পর মোটরোলা তাকে তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করে। এরপর নাইকি ছাড়াও ক্যামেরা প্রস্তুতকারক ক্যানন ও ঘড়ি প্রস্তুতকারী ট্যাগ হিউয়ার, কোলগেট-পালমোলিব ইতাদি প্রতিষ্ঠানের চুক্তিবদ্ধ হন শারাপোভা।  ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাব মতে, ২০০৫-এ সব মিলিয়ে তার আয় দাঁড়ায় ১৮.২ মিলিয়ন ইউএস ডলার। এ থেকে শারাপোভা বলেটিয়েরি একাডেমির কাছাকাছি ফ্লোরিডার ব্রাডেন্টনে ৪৭০০ বর্গফুটের একটি বাড়ি কিনেন, যার দাম ছিল ২.৭ মিলিয়ন ডলার। বাবা-মাকে নিয়ে তিনি ওঠেন তার সেই বাড়িতে। কষ্ট সার্থক হয় ইউরির।
আমি নতুন শারাপোভা
সোনালি চুল আর একহারা দীর্ঘাঙ্গী মারিয়া শারাপোভা আর তারই রুশ পূর্বসূরি আনা কুর্নিকোভার মধ্যে অনেক মিল। কুর্নিকোভা মাত্র ১৬ বছর বয়সে টেনিস বিশ্বের নজর কাড়েন। অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মডেলও হন তিনি। তবে টেনিস জগতের বড় কোন প্রতিযোগিতায় শিরোপা জিততে পারেননি তিনি। কুর্নিকোভা সর্বশেষ টেনিস টুর্নামেন্ট খেলেন ২০০৩-এ। হকি খেলোয়াড় সার্গেই ফেদেরভ আর পপ গায়ক এনরিক ইগলেসিয়াসের সঙ্গে প্রেমের খবরও বেশ আলোচিত হয় সে সময়। মডেলের মতো দেখতে হওয়া ছাড়াও দুই রুশ সুন্দরীর মধ্যে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা অনেক মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন। আর এজন্য অনেকেই শারাপোভাকে নতুন কুর্নিকোভা হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। তবে এসব তুলনায় বিব্রত বা নিজেকে ছোট মনে করেন শারাপোভা। ২০০৪-এ উইম্বলডন শিরোপা জেতার পর বেশ তীক্ষ্মভাবেই জবাব দেন তুলনার। তিনি বলেন, আমি কোন নতুন একজন নই এবং নিশ্চিতভাবেই আমি নতুন কুর্নিকোভা নই। এরপর তিনি বলেন, আমি নতুন শারাপোভা। মানুষ হয়তো ভুলে গেছেন, কুর্নিকোভা এখন আর দৃশ্যপটে নেই। এখন সময় কেবল মারিয়ার, আপনি আমাদের মধ্যে কোনভাবেই তুলনা করতে পারেন না। আর আসলে আনা একটি টুর্নামেন্টও জিততে পারেননি কখনও।’
সবচেয়ে ধনী মহিলা অ্যাথলেট
২০১৪ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাব অনুযায়ী মারিয়া শারাপোভা হলেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মহিলা খেলোয়াড়। তাদের হিসাব মতেই শারাপোভা গত বছর মোট আয় করেন ২২ মিলিয়ন ডলার। নাইকির সঙ্গে তার আট বছরে ৭০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি রয়েছে। পাঁচ বছর করে চুক্তি রয়েছে এইভান, কোল হান, ট্যাগ হিউয়ার। ছোটখাটো আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার চুক্তি রয়েছে। সেরেনার সঙ্গেও নাইকিসহ খ্যাতনামা অনেক প্রতিষ্ঠানের চুক্তি থাকলেও তিনি শারাপোভার চেয়ে প্রতি বছর আয়ে অন্তত ১০ মিলিয়ন ডলার পেছনে থাকেন। টেনিসের দর্শকরা সাধারণত ফুটবল-হকি-বাস্কেটবল বা ক্রিকেটের দর্শকদের চেয়ে বেশি অভিজাত ও ধনী শ্রেণীর হয়ে থাকেন। গলফ, ঘোড়দৌড়, সেইলিংয়ের ক্ষেত্রেও তাই। এজন্য এসব খেলায় পৃষ্ঠপোষকতায় ও বিজ্ঞাপনে আসে সব অভিজাত প্রতিষ্ঠানই। যেমন ভক্সওয়াগন কোম্পানির পোরশে গাড়িরও বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন শারাপোভা। এ গাড়ির ৮৫ ভাগ ক্রেতাই ছিলেন পুরুষ। তাই তারা মেয়েদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে শারাপোভাকে পছন্দ করেন। ২০১০-এ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক আনিতা এলবার্সে এক গবেষণায় দেখান যে, শারাপোভা কোন প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হলে তাদের বিক্রি অন্তত চার শতাংশ বেড়ে যায়।
শারাপোভা ২০১২ সালে সুগারপোভা নামে এক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এরা ক্যান্ডি গামি লিপস ও টেনিস বল চিউইং গাম উৎপাদন করে। পরে তারা পোশাক ও ফ্যাশন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্যও উৎপাদন করতে থাকে। নিজেই অনেক পোশাকের নকশা করে থাকেন শারাপোভা। নিজের আয় থেকে ৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন তিনি এ ব্যবসায়। উৎপাদনে যাওয়ার প্রথম ছয় মাসেই সুগারপোভা ৩০০০০ ব্যাগ ক্যান্ডি বিক্রি করে।
শারাপোভার দর্শন
‘কোন কিছুই আমাকে ভীত করে না। কারণ, আমি ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। চেষ্টা না করা পর্যন্ত আপিন কখনও জানেন না কি হবে। সুতরাং, যদি চেষ্টা না করেন আপনি তো ব্যর্থ হবেনই। আমি সেরা হওয়ার জন্য সবসময় চেষ্টা করি কেবল।’ ‘টেনিস অবশ্য আমাকে অনেক অর্থ, যশ আর খ্যাতি এনে দিযেছে। আর এজন্যই আমি এত অক্লান্ত পরিশ্রম করছি, অনুশীলন করছি। তবে কেবল এটাই আমার জীবন নয়।’
শারাপোভা কারও প্রতি বিদ্বেষী বা হিংসাপরায়ণও  নন। বরং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের ব্যাপারে উদার। তাদের প্রশংসা করতেও দ্বিধা করেন না। এই যেমন সেরেনাকে হারিয়ে উইম্বলডন জেতার পর বলেছেন, সেরেনার কাছে অনেক খেলায় হেরে গেছেন তিনি। ১৭ বারের মোকাবিলায় জিতেছেন মাত্র একবার। কিন্তু সেরেনার সম্পর্কে তার সরল উত্তর, আপনি নিশ্চয় ভাল খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধেই খেলতে চান, আর সে তো সবার সেরা। হ্যাঁ, আপনি তার বিরুদ্ধে অনেকবার জিততে পারবেন না। তবে আমি যদি সেরেনার মতো কারও সঙ্গে খেলার সুযোগ পাই তবে আমিও ভাল করবো। আমি তাকে হারানোর চেষ্টা তো করতে পারবো। আমি তাকে সহজে ছাড় দেবো না। আমি তো একজন লড়াকু প্রতিদ্বন্দ্বী।’ শারাপোভা টেনিস খেললেও দেখেন খুব কম। বলেন, আমি টেনিস ভালবাসি তবে দেখার সুযোগ হয় কম। তবে ও (বুলগেরিয়ান খেলোয়াড় গ্রিগর দিমিত্রভ) যখন খেলে তখন টেলিভিশনের সামনে বসে পুরো খেলা দেখি।
শারপোভা ম্যাচের প্রতিটি পয়েন্টের বেলায় সেটা হারুক আর জিতুক শেষটায় একই রকম করেন। তিনি বেস লাইনের পেছনে আসেন এবং দর্শকদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তার র‌্যাকেটের তারগুলো পরখ করে নেন। মুখে একরকম আভা ছড়িয়ে বলটাকে কয়েকবার মাটিতে ড্রপ খাওয়ান। এরপর বল ঘুরিয়ে সার্ভ করেন তীব্রগতিতে।
ব্যক্তিজীবন
কোর্টের বাইরে তার চেহারার সৌন্দর্য তাকে আরও বেশি জনপ্রিয় করেছে। তার প্রতি অনেক পুরুষের আগ্রহ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে যার সঙ্গে সম্পর্ক হবে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতেই পারেন। ২০০৯ সালে সেøাভেনিয়ান এক পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় শারাপোভার। সাশা ভুয়াসিচ নামের ওই খেলোয়াড়ের সঙ্গে এক বছর প্রেম করার পর তারা ঘোষণা দেন ২০১০-এর অক্টোবর থেকে পরস্পর বাগদানও করেছেন। কিন্তু ২০১২ সালের ইউএস ওপেন চলাকালে এক সংবাদ সম্মেলনে শারাপোভা জানান, তাদের মধ্যকার বাগদান আর নেই, ভুয়াসিচের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ। এরপর বুলগেরিয়ান টেনিস খেলোয়াড় গ্রিগর দিমিত্রভের সঙ্গে ২০১৩ থেকে প্রেম করে আসছেন শারাপোভা। ওই বছরের ১৩ই মে স্পেনের মাদ্রিদের রাস্তায় প্রকাশ্যে তারা পরস্পরকে চুম্বন করেন। সেই দৃশ্য প্রচারিত হয় সর্বত্রই। তখন থেকেই কার্যত স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করছেন তারা।
মায়ের ভূমিকা সম্পর্কে
অতীত ভুলে যাননি শারাপোভা। রাশিয়ায় তার খুব বেশি স্মৃতি না থাকলেও বলেন, আমি যেখান থেকে এসেছি তার জন্য আমি গর্বিত। তার মাকে খুব একটা দেখা না যাওয়ায় তিনি অনেকটা রহস্যাবৃতই রয়ে গেছেন। ইয়েলেনাকে মেয়ের খেলার সময়ও দেখা যায় না। কেউ কেউ আবার তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও বিস্মিত মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনেও অনেক সময় প্রশ্নের মুখোমুখি হন মায়ের সম্পর্কে। একবার এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনার পিতাকে তো সব সময় দেখা যায়। তো আপনার ক্যারিয়ারে মায়ের কোন ইতিবাচক ভূমিকা আছে কিনা। তার উত্তর, মা আমার মধ্যে সব ইতিবাচক জিনিসেরই জন্মদাতা। তিনি খুবই শান্ত ও বুদ্ধিমান মহিলা। তিনি জীবন নিয়ে অনেক সুখি। নিজের জীবন নিয়ে এবং আমাকে নিয়েও সুখি। মা-বাবা দুজনই আমার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যে জন্য আমি আজ এ জায়গায় আসতে পেরেছি। আমার মা আমাকে সব সময় শিক্ষিত করে তুলতে চাইতেন। তিনি আমার পড়া তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন সব সময়। এখন বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব তারই। তিনি আমার ভক্তদের মেইলের জবাবও দিয়ে থাকেন। তিনি খুব চমৎকার একজন মহিলা।