মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে বাংলাদেশী পর্যটকেরা হয়রানির শিকার

4

প্রবাসীকণ্ঠ নিউজ : মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কেএলআই ১ ও ২ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশী পর্যটকেরা হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘ দিন ধরে দেশটির ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের হাতে পর্যটকেরা নাজেহাল হতে থাকলেও বিষয়টি নিরসনে আজো বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
যার কারণে বাংলাদেশী পর্যটকেরা এখন মালয়েশিয়াকে বাদ দিয়ে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্রঘেরা শান্ত বালি দ্বীপকেই বেছে নিচ্ছেন। এতে করে বিপুল বাংলাদেশী পর্যটক হারাচ্ছে মালয়েশিয়া। পর্যটনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশী বিপুল পর্যটক ধরে রাখতে দ্রুত এসব বিষয় নিরসনে মালয়েশিয়া সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার কেএলআই ১ ও কেএলআই ২ বিমানবন্দরে নেমে শতাধিক বাংলাদেশী পর্যটক হয়রানির শিকার হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তারা বাংলাদেশী পর্যটকদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে একপর্যায়ে ফিরতি ফ্লাইটে তাদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেন। ফেরত আসা পর্যটকদের মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নিটল মোটরস ও কসমেটিকসের দু’টি বড় গ্রুপকে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। তারা নিছক ভ্রমণের উদ্দেশ্যেই ব্যবসায়ী দু’টি গ্রুপ সেখানে গিয়েছিল; কিন্তু ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের ফেরত পাঠিয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। শুধু ব্যবসায়ী দুু’টি গ্রুপ নয়, কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে নেমে হয়রানির শিকার হয়েছেন এমন অভিযোগের শেষ নেই; কিন্তু বিষয়টি নিয়ে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসও নির্বিকার।
মাসুদ রানা নামে একজন ব্যবসায়ী (পাসপোর্ট নম্বর-এএফ-৮৬৯৮৫৭২) সম্প্রতি ঘুৃরতে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়া। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফ্লাইট থেকে নামার সাথে সাথেই তাকে হয়রানির মুখে পড়তে হয়। বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা প্রথমেই তার পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেন এবং অন্য অনেকের সাথে তাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখেন। এরপর তাকে ইমিগ্রেশনের কাছে একটি কক্ষের সামনের ফ্লোরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। আরেক টুরিস্ট মিজানুর রহমান (পাসপোর্ট নম্বর-বিএইচ ০৭৬৩৪৮৬) জানান, বিমানবন্দরে নামার পরপরই তাকে দীর্ঘসময় দাঁড় করিয়ে রাখার পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের মুখোমুখি করানো হয়। তারা তাকে এমন সব প্রশ্ন করেন, যা রীতিমতো বিব্রতকর। মানিব্যাগ খুলে কত ডলার আছে সেটি তারা দেখতে চান।
একইভাবে মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের কাছে অভিযোগ করেছেন মাজহারুল আনোয়ার, ব্যাংক কর্মকর্তা জয়নুল আবেদিন, সাইফুল ইসলাম, কালাম আবদুস সোবহান, সাংবাদিক জাহিদ হোসেনসহ আরো অনেকেই।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভিয়েশন আ্ইন অনুযায়ী বিমান থেকে যাত্রী নামার পর ইমিগ্রেশন পর্যন্ত নো ম্যানস ল্যান্ড। এই জায়গার মধ্যে কোনো যাত্রীকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া হয়রানি করা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সম্প্রতি একটি এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠান হয়রানি ও ভোগান্তির লিখিত নানা অভিযোগ উল্লেখ করে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন।
গতকাল টোয়াবের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে বাংলাদেশের প্রকৃত ট্যুরিস্টরা ব্যাপক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা মানবপাচারের মতো ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাধারণ যাত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছেন প্রতিনিয়ত। এর দ্রুতই সমাধান করতে হলে আগে মালয়েশিয়া সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। যাত্রীর পাসপোর্ট, ভিসা, ডলারসহ প্রয়োজনীয় সব কিছু দেখানোর পরও কী কারণে পর্যটকদের বিমানবন্দরে নামার পরই হয়রানি করা হচ্ছে সেটি দেশটির সরকারের সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা উচিত।
গতকাল বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আখতারুজ্জামান খান কবিরের সাথে যোগাযোগ করে মালয়েশিয়া বিমানবন্দরে পর্যটক হয়রানির ব্যাপারে বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি টেলিফোন ধরেননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্র্রতিক বছরগুলোয় দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সামনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নতির ফলে বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশকে এখন নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ২২ মিলিয়ন মধ্যবিত্ত উন্নত জীবন যাপন করছেন। তাদের রুচিবোধ পাল্টেছে। ছুটিতে বিদেশ ভ্রমণ এখন তাদের নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে। এমন যখন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা তখন কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে বাংলাদেশী প্রকৃত পর্যটকদের হয়রানির শিকার হওয়া খুবই বিব্রতকর। তাদের অভিমত, এভাবে চলতে থাকলে মালয়েশিয়ার পর্যটন খাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আস্তে আস্তে মুখ ফিরিয়ে নেবেন সবাই। তারা বলছেন, পর্যটন খাত শক্তিশালী করতে ইন্দোনেশিয়ার সরকার বাংলাদেশসহ বহু দেশকে পোর্ট এন্ট্রি ভিসায় বালি ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে। সম্প্রতি বালিতে ঘুরতে গিয়ে দেখা গেছে, স্রোতের মতো ট্যুরিস্ট প্রবেশ করছেন সমুদ্রঘেরা শান্ত বালি দ্বীপে।
গতকাল রাতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের ওসি (এএসপি) আব্দুল্লাহ আল মামুন, তারা কী কারণে আমাদের পর্যটকদের ফেরত পাঠাচ্ছে সেটি আমি ঠিক বলতে পারছি না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বিমানবন্দর থেকে যাত্রী ফেরত আসে। পাসপোর্ট, ভিসা সবই ঠিক আছে তারপরও দেশটির ইমিগ্রেশন ফেইক পাসপোর্ট ভিসার কথা বলে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমরা তো সবকিছু ওকে থাকার পর ক্লিয়ারেন্স দিচ্ছি।