‘ভ্রমণে ভিসা নয়, আমি গুরুত্ব দেই লাল-সবুজের পতাকাকে’

13

বাংলাদেশের এক সাহসী নারী নাজমুন নাহার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে দেশের পতাকা বহন করে ইতোমধ্যে ঘুরেছেন ১৩০ টি দেশ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ভ্রমণে ভিসা নয়, আমি গুরুত্ব দেই লাল-সবুজের পতাকাকে। মানুষ চাঁদে গেছে পতাকা হাতে।  ২৮ আগস্ট বুধবার নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এলাকায় সাহসী এ নারীর সাথে এক আড্ডা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসময় নাজমুন নাহার এসব কথা বলেন। বাংলা খবর ডট নেট এর সম্পাদক শওকত ওসমান রচি’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সৈয়দ মোস্তফা আল আমিন।

আড্ডায় অংশগ্রহণকারীরা তন্ময় হয়ে শোনেন নাজমুন নাহারের বিশ্ব অভিযানের অভিজ্ঞতা। বিপদ সংকুল পরিস্থিতিতে তার এ দু:সাহসিক অভিযানের সময় নানান প্রতিকূল অবস্থা কিভাবে প্রতিহত করে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে ঘুরেছেন তার বর্ণনা দেন নাজমুন নাহার।

আড্ডার শুরুতে নাজমুন নাহারের বড় ভাই আমিনুল ইসলাম স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে নজমুন নাহারের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দেন অতিথিরা।

এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিশিষ্ট সাংবাদিক মনজুর আহমেদ, সাপ্তাহিক ঠিকানার সম্পাদক ফজলুর রহমান, সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, সাপ্তাহিক বর্ণমালা সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, টাইম টেলিভিশনের সিইও এবং সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার সম্পাদক আবু তাহের, সাপ্তাহিক প্রবাস পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ, সিনিয়র সাংবাদিক নিনি ওয়াহেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকিত চৌধুরী, দৈনিক প্রথম আলোর নিউইয়র্ক ব্যুরো চীফ ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক মুজাহিদুল আনসারী, কমিউনিটি এক্টিভিস্ট কামাল হোসেন মিঠু, অধ্যাপিকা হোসনে আরা, বাংলাভিশন টেলিভিশনের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ফটো সাংবাদিক নিহার সিদ্দিক, দৈনিক সংবাদের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি সঞ্জীবন সরকার, বিশিষ্ট ফটো সাংবাদিক এ হাই স্বপন ও খোরশেদ আলম রিংকু , প্রথম আলোর সাংবাদিক মঞ্জুরুল হক, শো-টা্ইম মিউজিক এর কর্ধার আলমগীর খান আলম, সাপ্তাহিক জনতার কন্ঠের প্রকাশক শামসুল হক, অনলাইন ইউএস বাংলা পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ হামিদ, জ্যামাইকা-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি শেখ হায়দার আলী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ি কামরুজ জামান বাচ্চু, বাগেরহাট জেলা সোসাইটির সেক্রেটারি খোন্দকার মুরাদ হোসেন, বিএসএ অব এনওয়াই প্রেসিডেন্ট শেখ আল আমিন প্রমুখ।

নজমুন নাহার জানান, এই দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় পৃথিবীর পথে পথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের লক্ষ কোটি নারীকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, নারীদেরকে কৌশলী হতে শিখাবে। শুধু তাই নয় ভয়হীন ভাবে কিভাবে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে হবে সেই আল্পনা অংকিত করে যাচ্ছেন তিনি। এ যাত্রা পথে তিনি মধ্যরাতে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে আটকা পড়েছেন, সাহারা মরুভূমিতে মরুঝড়ের মধ্যে রক্তাক্ত হয়েছেন, পোকা মাকড়ের কামড় খেয়েছেন আফ্রিকার জংলী পথে, অন্ধকারে অচেনা শহরে পথ হারিয়েছেন, তিন মাস আফ্রিকাতে আলু খেয়ে ছিলেন, কখনো না খেয়ে ছিলেন! কখনো কাঠের মধ্যে, কখনো পাথরের উপর, কখনো আদিবাসীদের সাথে জঙ্গলে তাকে ঘুমাতে হয়েছে বিভিন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়ে। কখনো রাতের অন্ধকারে বর্ডার ক্রস করতে না পেরে অপরিচিত স্থানীয় পরিবারের সাথে ঘুমাতে হয়েছে। কখনো পড়ে গিয়েছেন, কিন্তু ভেঙে পড়েননি, লাল সবুজের পতাকা হাতে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। মৃত্যুর হাতছানি দেখেও মৃত্যুকে জয় করে উঠেছেন সু উচ্চ পর্বতের চূড়ায়। গেঁথে এসেছেন লাল-সবুজের পতাকা।

গার্লস গাইড করার সুবাদে তিনি স্কুল জীবনে ২০০০ সালে প্রথম ভারতের ভূপাল সফরে যান। ৮০টি দেশের পক্ষে অংশ নেয়া ছেলে মেয়েদের সামনে তুলে ধরেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। তিনি জানান, তার লক্ষ্য বিশ্বের ২০০টি দেশে বাংলাদেশের পতাকাকে পৌঁছে দিয়ে এক অনন্য রেকর্ড গড়ার মাধ্যমে পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিক মূল্যবোধকে এগিয়ে নেয়া।

নাজমুন নাহার তার সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ বর্ণনার সময় জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলে ভ্রমণের সময় তাকে গভীর জঙ্গল, হিংস্র পশু, হিংস্র মানুষ, পোকা-মাকর মোকাবেলা করে এগুতে হয়েছে। কখনো বাধ্য হয়ে তিনি কাঁচা গরুর মাংসও খেয়েছেন। বিশেষ করে আফ্রিকার অনেক জায়গায় সুপেয় পানির অভাবে কষ্ট পেয়েছেন। তারপরও তিনি প্রত্যন্ত এলাকায় গেছেন বাংলাদেশের পতাকা হাতে, বাংলাদেশকে পরিচিত করতে পেরেছেন। বিশ্বের সব দেশকে একটি ছাতার নিচে দেখতে চান বাংলাদেশের এ নারী, যেখানে হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি থাকবে না, থাকবে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা আর সম্মান।

পরে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নাজমুন নাহার জানান, সুইডেনে পড়তে গিয়ে সে দেশের পাসপোর্ট তিনি নিয়েছেন একটি উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন দেশের ভিসা পেতে সুবিধা রয়েছে এ পাসপোর্টে। সেদেশে একটি গবেষনা প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করে যা আয় করেন সে টাকা দিয়েই তিনি দেশে দেশে ঘুরেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশে ইয়ুথ হোস্টেল আছে যেখানে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

নজমুন নাহার ১০০ তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক সৃষ্টি করেন পূর্ব আফ্রিকার জিম্বাবুয়েতে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের উপর ১ জুন ২০১৮ সালে। সর্বশেষ ১৩০ তম দেশ হিসেবে ভ্রমণের রেকর্ড কানাডায় এ বছরের ২৩ আগস্ট। অভিযাত্রার সঙ্গী হিসেবে ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মাকে নিয়ে ঘুরছেন পৃথিবীর ১৪ টি দেশ। কখনো সাহারার মরুভূমি, কখনো বিপদসঙ্কুল আফ্রিকান জঙ্গল আবার কখনো বা সমুদ্রের তলদেশে গিয়েছেন। নাজমুন নাহার পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই ভ্রমণ করেছেন সড়ক পথে একা একা, এ তালিকার মধ্যে রয়েছে পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও যুগোস্লাভিয়ার প্রতিটি দেশ, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ।

২০১৮ সালের ২৩ মার্চ ‘তারুণ্যের আইকন’ উপাধি পান অনন্যা সম্মাননার মাধ্যমে। তার বিশ্ব অভিযাত্রার মাইলফলকের সম্মাননা স্বরূপ জাম্বিয়া সরকারের গভর্ণর হ্যারিয়েট কায়োনা’র কাছ থেকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল উপাধি লাভ করেন। এছাড়া ওই বছর অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল সন্মাননা লাভ করেন। এছাড়া লাভ করেন জনটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, তিন বাংলা সন্মাননা ও রেড ক্রিসেন্ট মোটিভেশনাল অ্যাওয়ার্ড।

১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর লক্ষীপুর সদর জেলার গঙ্গাপুরে জন্ম নেয়া নাজমুন নাহার শিক্ষা জীবনে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ‘এশিয়ান স্টাডিজ’ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন ২০০৯ সালে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে ‘হিউমান রাইটস এন্ড এশিয়া’ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন ২০১৫ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নতকোত্তোর ডিগ্রি অর্জন করেন ২০০৪ সালে। এছাড়া লক্ষীপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ১৯৯৬ সালে, দালাল বাজার এন কে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ১৯৯৪ এবং নন্দনপুর প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন।

বাংলাদেশের পতাকা হাতে তার এই দুর্বার বিশ্বজয় কতটা কঠিন ও বিপদসংকুল অভিযাত্রা ছিলো তা নিয়ে তিনি বলেন, পশ্চিম আফ্রিকা ভ্রমণের সময়ও আমি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। মৃত্যুকে জয় করে আজ আমার বেঁচে থাকা এই মৃত্যুঞ্জয়ী আমি বাকি সব দেশ ভ্রমণের স্বপ্ন দেখছি এখনো।