বৃটিশ রাজনীতিতে ফের নাটকীয়তা

2

বৃটিশ রাজনীতিতে নাটকীয়তার অন্ত নেই যেন। একের পর এক হতবাক করা সব ঘটনা ঘটে চলেছে দেশটিতে। গত দুই সপ্তাহে তা পূর্বের সকল মাত্রা ছাড়িয়েছে। অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে, একদিনের মধ্যে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা  হারিয়েছে ক্ষমতাসীন সরকার। বিদ্রোহ করেছেন সরকারদলীয় ২১ সংসদ সদস্য। আগাম নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষে বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো পার্লামেন্ট বসে। প্রথম দিনের অধিবেশনে বড় ধরনের পরাজয়ের স্বীকার হয়েছেন জনসন। তার নিজ দলের ২১ এমপি বহিষ্কারের হুমকি উপেক্ষা করে সরকারবিরোধী একটি বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিরোধী ও বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের হাতে। বুধবার সেখানে ব্রেক্সিট কার্যকরের সময়সীমা পেছাতে একটি বিল উত্থাপন করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি বিলটি নিয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে পাস হলে বৃহসপতিবার তা যাবে উচ্চকক্ষে। স্থানীয় গণমাধ্যম অনুসারে, মঙ্গলবার বহিষ্কারের হুমকি উপেক্ষা করে কনজারভেটিভ পার্টির ২১ জন এমপি জনসন সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক কয়েকজন মন্ত্রীও। চুক্তিহীন ব্রেক্সিট ঠেকাতে বিরোধীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন তারা। এর ফলে পার্লামেন্টে ৩২৮-৩০১ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছে সরকার। মঙ্গলবার রাতে এ ভোটের ফলে পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ এখন ‘চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট বিরোধীদের’ হাতে। এর অর্থ হলো ব্রেক্সিট সম্পাদনের সময়সীমা বিলম্বিত করতে বুধবার পার্লামেন্টে বিল আনতে পারবেন তারা। এই বিলে তারা ব্রেক্সিট সম্পাদনের সময়সীমা ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়াতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম। যদি তাই হয় তাহলে চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের সম্ভাবনা থাকবে না। ব্রেক্সিট ইস্যু নিয়ে বহুদিন ধরে ভুগছে বৃটিশ রাজনীতি। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের পক্ষে গণভোটের পরপরই পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তারপর ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বে ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে আসেন তেরেসা মে। কিন্তু পার্লামেন্ট তার প্রস্তাবিত ব্রেক্সিট চুক্তিতে সম্মত না হওয়ায় তিনিও পদত্যাগ করেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে পরপর দুইবার ব্রেক্সিট কার্যকরের সময়সীমা পেছান তিনি। মে’র পর প্রধানমন্ত্রী ও কনজারভেটিভ দলের নেতা নির্বাচিত হন জনসন। ক্ষমতায় এসেই ৩১শে অক্টোবরের মধ্যে ব্রেক্সিট সম্পাদনের প্রত্যয় ঘোষণা করেন। হোক তা চুক্তি সহ বা চুক্তি ছাড়া।  সমপ্রতি পাঁচ সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্ট স্থগিতের ঘোষণা দেন তিনি। এতে চুক্তিহীন ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায় বিরোধীদের মনে। তারা অভিযোগ করে, পাঁচ সপ্তাহ পার্লামেন্ট বন্ধ থাকলে ব্রেক্সিট নিয়ে পার্লামেন্টে কোনো চুক্তি পাস করা কঠিন হয়ে পড়বে। জনসনের ঘোষণা অনুযায়ী, স্থগিতাবস্থা শেষে ১৪ই অক্টোবর নতুন অধিবেশন শুরু হবে পার্লামেন্টে। তখন ব্রেক্সিট সমপাদনের জন্য সময় থাকবে মাত্র দুই সপ্তাহ। এদিকে, মঙ্গলবার পার্লামেন্টে জনসন ফের নিশ্চিত করেন যে, তিনি ৩১শে অক্টোবর ইইউ থেকে বের হয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রয়োজনে কোনো চুক্তি ছাড়াই। এমতাবস্থায় ব্রেক্সিট নিয়ে সংশয় থেকে বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়েছেন তারই ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভের ২১ এমপি। এর একদিনের মাথায় তাদের বহিষ্কার করেন জনসন। ফলস্বরূপ, তারা এখন পার্লামেন্টে স্বাধীন সংসদ সদস্য হিসেবে যোগ দেবেন। এদিকে, মঙ্গলবার অধিবেশনের আগ দিয়ে জ্যেষ্ঠ কনজারভেটিভ নেতা দলত্যাগ করে লিবারেল ডেমোক্রেটদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। ফলে অধিবেশন শুরুর আগেই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় তার দল।
এমতাবস্থায়  তিনি বলেছেন, অক্টোবরে নির্বাচনের প্রচেষ্টা চালানো ছাড়া তার কিছু করার নেই। কারণ তিনি বলছেন, দেশের জনগণকেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও এটিও তার জন্য খুব সহজ হবে না। কারণ বৃটেনে ২০১১ সালের একটি আইনে পার্লামেন্টকে পাঁচ বছরের মেয়াদ দেয়া হয়েছে। এখন সেটি পরিবর্তন করতে হলে সংসদে বরিস জনসনের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন লাগবে। তা পেতে হলে তার বিরোধী দল লেবার পার্টির সমর্থন দরকার হবে। সেই সমর্থন পাওয়া জনসনের জন্য খুব একটা সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আগাম নির্বাচনের প্রস্তাব
বুধবার পার্লামেন্টে দেয়া এক ভাষণে লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের প্রতি আগাম নির্বাচনের প্রস্তাব তোলেন জনসন। তিনি চুক্তিহীন ব্রেক্সিট ঠেকাতে বিরোধীদলীয় জোটের বিলটিকে ‘আত্মসমর্পণ বিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বলেন, আত্মসমর্পণ বিলটি পাস হলে বিরোধী দলের নেতা কী ১৫ই আগস্ট একটি নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে এই দেশের জনগণকে তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ দেবেন?  তবে জনসনের প্রস্তাবে সাড়া দেননি করবিন। তিনি জানান, লেবার পার্টি সরকারের ফাঁদে পা দেবে না। চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত নতুন নির্বাচন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাবে না তার দল।