পারবেন তো শেখ হাসিনা?

2

মহিউদ্দিন খান মোহন :

ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে সংগঠন থেকে বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজ দলে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তা জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একমাত্র তাঁর ও সরকারের কট্টর বিরোধী ছাড়া দেশের প্রায় সব মানুষ এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে, সমর্থন করেছে। তারা মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের এ শুদ্ধি অভিযান যদি প্রভাবমুক্ত অবস্থায় অব্যাহত রাখা যায়, তাহলে বিগত দিনে জনমনে যে ক্ষোভ-হতাশা পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছিল, তার অনেকটাই প্রশমিত হবে। একই সঙ্গে তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তিকে নিয়ে যাবে অন্য এক উচ্চতায়। কেননা, ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক স্বীয় দলের দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যাপকভিত্তিক অভিযান আমাদের দেশে বিরল। আমরা লক্ষ্য করেছি, কিছুদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি-অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন। অনেকবার তিনি বলেছেন, অচিরেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করবেন। তাঁর সেসব কথাকে কেউ কেউ কথার কথা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা যে কথার কথা ছিল না, এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। যে সংকল্প তিনি একান্তে নিয়েছিলেন, তা কার্যকর করে প্রমাণ দিলেন, সদিচ্ছা থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। ছাত্রলীগে অপারেশনের পরপরই প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এরপর যুবলীগকে ধরব। তিনি কথা রেখেছেন। শুদ্ধি অভিযানের শিকার হয়ে দুই যুবলীগ নেতা এখন পুলিশের কব্জায়। যাদের র‌্যাব-পুলিশ আটক করেছে তাদের ক্রিয়াকর্মের কথা নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। গণমাধ্যমের বরাতে তা সবাই এখন সম্যক অবগত। তবে ভাবলে অবাক হতে হয়, প্রশাসনের নাকের ডগায় তারা এসব অপকর্ম নির্বিঘ্নে এত দিন চালিয়ে আসছিল কীভাবে? তারা কি এতটাই বলশালী ছিল যে, প্রশাসন তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করার সাহস দেখায়নি? বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে এক যুবলীগ নেতার সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরার একটি ছবি দেখে। পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ছবি দেখে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, এখন তো দল ক্ষমতায়, তাহলে ওর এত ভয় কেন? এটা কি ভয় না নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রদর্শনের মহড়া তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। কারণ, ওরা যে ধরনের কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিল, তাতে নিজ দলেরই একাধিক প্রতিপক্ষ হয়তো ছিল বা আছে। তাদের মোকাবিলার জন্য এ ধরনের সশস্ত্র ক্যাডার প্রতিপালন আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারদের জন্য আবশ্যক হয়ে থাকে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসা এবং অভিযান শুরুর নির্দেশ দেওয়ার আগে প্রশাসনের নজরে তা এলো না কেন? মতিঝিলে দিন-রাত ক্যাসিনো চালাচ্ছিল যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তার ক্যাসিনোর তিন-চার শ গজের মধ্যেই মতিঝিল থানার অবস্থান। প্রকাশ্যে এ অবৈধ ব্যবসা চললেও পুলিশ তার দিকে একবারও দৃষ্টি দেয়নি। বরং তারা দেখেও না দেখার ভান করেছে। এর নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। জানা গেছে, রিমান্ডে থাকা খালেদ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে পুলিশকে। তার কাছ থেকে কারা কারা নিয়মিত দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হিসেবে ‘সালামি’ নিত তাদের কথাও সে বলেছে। সে তালিকায় তার সংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন নেতা, পুলিশ প্রশাসনের কিছু সদস্যও রয়েছেন।

একই ধরনের তথ্য দিয়েছে গ্রেফতার যুবলীগ-আওয়ামী লীগ নেতা জি কে শামীম। রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে দিয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গণপূর্ত অধিদফতরের দুই শীর্ষ প্রকৌশলীকে ঘুষই নাকি দিয়েছে সে দেড় হাজার কোটি টাকা! এর মধ্যে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে ১ হাজার ১০০ কোটি এবং সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইকে ৪০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছে শামীম। এ ছাড়া যুবলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে সে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা মাসহারা দিত। গ্রেফতার এ দুই যুবলীগ নেতার দেওয়া তথ্যে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তারা কীভাবে এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। কেউ যদি ভাবেন এরা একা একাই এত দূর পর্যন্ত এসেছে, তাহলে ভুল হবে। ফ্রীডম পার্টির কর্মী থেকে খালেদের যুবলীগের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠান কারও পৃষ্ঠপোষকতা-আশীর্বাদ ছাড়াই হয়েছে- এমন ভাবাটা বোকামিই হবে। ভাবতে অবাক লাগে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দলের একজন কর্মী কী করে বঙ্গবন্ধুর দলের নেতা হয়ে গেল! যারা তাকে দলে নিয়েছেন, প্রশ্রয়-পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তারা কি বিষয়টি জানতেন না? কারণ, খালেদ তো এলাকায় অপরিচিত কেউ ছিল না। আমরা জানি না প্রধানমন্ত্রী তাঁর দলের নেতাদের এ প্রশ্নটি করবেন কিনা।

অন্যদিকে একজন স্কুলশিক্ষক ও সাধারণ গৃহিণীর ছেলে জি কে শামীমের রাতারাতি ‘টেন্ডার মোগলে’ পরিণত হওয়া এবং সেই সুবাদে তার ধনকুবের বনে যাওয়ার খবর রূপকথাকেও হার মানায়। যেন তার হাতে আলাদিনের চেরাগ ছিল; ঘষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈত্য এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘গোলাম হাজির! হুকুম করুন মালিক’। আর শামীম হুকুম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈত্য তার অফিসে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর রেখে গেছে! কীভাবে সে এত বিত্ত-বৈভবের মালিক হলো? নিশ্চয়ই তার কাছে আলাদিনের চেরাগের নবতর কোনো সংস্করণ রয়েছে। আর সে চেরাগ হলো ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে সখ্য। যার সুবাদে তাদের নাম ভাঙিয়ে আঙ্গুল ফুলে বটগাছে পরিণত হওয়ার পথ বের করে নিয়েছে। শামীমকে গ্রেফতারের পর এখন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তার দায়িত্ব নিতে নারাজ। শামীম এত দিন পরিচয় দিয়ে এসেছে সে আওয়ামী যুবলীগের সমবায়বিষয়ক সম্পাদক। গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বলে দিলেন, সে যুবলীগের কেউ নয়, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। অথচ ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে শামীমের অন্তরঙ্গ ছবি এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ঘুরছে। তার ছবি আছে সরকারের মন্ত্রী এবং অন্য প্রভাবশালীদের সঙ্গেও। এমনকি যে র‌্যাব তাকে আটক করেছে, সেই র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের একটি নির্মাণকাজে তাকে দেখা যাচ্ছে অতিথি হিসেবে কাজ উদ্বোধন করতে। এই জি কে শামীম একসময় বিএনপি সরকারের পূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিল বলেও খবর বেরিয়েছে। তখন তার পরিচিতি ছিল জাতীয়তাবাদী যুবদলের নেতা হিসেবে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সে সাপের খোলস বদলের মতো নিজের পরিচয়টাও বদলে ফেলেছে। আর এ পরিচয় বদল করেই শামীম পূর্ত বিভাগে তার টেন্ডার সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছে। বলা যায় না এরপর যদি আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসত, তাহলে এই জি কে শামীম খোলস পাল্টে জিয়ার সৈনিকে হয়তো পরিণত হতো।

রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের কথা আমরা প্রায়ই বলি, প্রকাশ করি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কিন্তু এর মূল কারণ এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে খুব একটা ভাবী কি? দুঃখজনক হলো, এটা যাদের ভাবার কথা তারা থাকছেন নির্বিকার। অনেকটা নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমানোর মতো। একজন দুর্বৃত্ত, একজন চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ স্বীয়স্বার্থ হাসিল করতে দলের ভাবমূর্তির যে বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে, আমাদের রাজনীতিকরা তা মোটেও ভাবেন বলে মনে হয় না। বরং না জানার ভান করে তারা ওইসব দুষ্কৃতিকারী-দুর্বৃত্তকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে লাউয়ের ডগার মতো লকলকিয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেন। কিন্তু তারা এটা একবারও ভেবে দেখেন না যে, এর দ্বারা তারা নিজের দল, সমাজ ও রাজনীতির কত বড় সর্বনাশ করে চলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে শুভকাজটি শুরু করেছেন, তা নিয়ে চলছে নানা ধরনের কথাবার্তা। সরকারি দলের পদস্থ নেতারা সরকারের এই সাফল্যের কথা জনগণের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সব দোষ পূর্ববর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপানোর জন্য। কেউ বলছেন, বিএনপিই ঢাকাকে ক্যাসিনোর শহর বানিয়েছে, কেউ বলছেন, জিয়া দেশে জুয়ার প্রচলন শুরু করেছিলেন ইত্যাদি। অন্যদিকে সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিও এ বিষয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারছে না। তারা সরকারের এ ভালো পদক্ষেপকে সাধুবাদ না জানিয়ে চিরাচরিত পন্থায় অভিযোগ করে চলেছে। বলা বাহুল্য, দুই পক্ষের কতিপয় নেতার এ বাগ্যুদ্ধকে জনগণ ভালো চোখে দেখছে না। তাদের কথা হলো, কে কবে কী করেছিলেন বা কীভাবে একটি অপরাধের প্রচলন হয়েছে সেটা বড় কথা নয়। বরং এখন সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটাকে সর্বব্যাপী করার জন্য ক্ষমতাসীন নেতাদের যেমন প্রশাসনকে সহযোগিতা করা উচিত, তেমনি বিরোধী দলের উচিত সরকারকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটির চাইতে বর্তমানে সঠিক কাজটি করার দিকেই যে অধিকতর মনোযোগ দেওয়া জরুরি- এ কথা তাদের কে বোঝাবে? আর সরকারের ভালো কাজের প্রতি সমর্থন দিতে আমাদের দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কৃপণতার কথা তো সর্বজনবিদিত। চলমান অভিযান নিয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়ায় তা আবারও প্রমাণিত হলো। যেখানে সরকারের এই শুদ্ধি অভিযানকে সাধুবাদ জানানো উচিত, সেখানে আমরা দেখছি ইনিয়ে বিনিয়ে সরকারের ঘাড়েই তা চাপিয়ে দেওয়ার কসরত। আজ যে শামীমকে নিয়ে এত তোলপাড়, তার এই অবস্থানে আসার পেছনে বিএনপির অবদান কি কম কিছু? মির্জা আব্বাসের ডান হাত বলে পরিচিত বাসাবোর শামীমকে পূর্ত অধিদফতরের কে না চিনত? শামীম এখন নতুন জার্সি পরেছে। তাই বলে এই টেন্ডার-দুর্বৃত্তের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার ইতিহাস তো মিথ্যা হয়ে যাবে না।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতারা এসব নিয়ে যত ইচ্ছা কথার লড়াই চালিয়ে যান, জনগণ তাতে কর্ণপাত করবে না। তাদের প্রত্যাশা, দুর্নীতি-অপরাধের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতি যে আশার আলো জ্বালিয়েছে, তা হঠাৎ করে যেন নিভে না যায়। তারা মনে করে, প্রধানমন্ত্রী তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে সাফল্য নিশ্চিত। হয়তো এই শুদ্ধি অভিযানের জালে আটকা পড়বে আরও কিছু রুই-কাতলা, রাঘববোয়াল; যারা ক্ষমতাসীন দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী বা প্রভাবশালীদের পক্ষপুটে আশ্রিত। আর এখানেই জনমনে সঞ্চারিত ভয় ও শঙ্কা। স্বার্থবাদীদের কোনো কূটচালে সরকার তথা প্রধানমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত মাঝপথেই মুখ থুবড়ে পড়ে কিনাÑ এ সংশয় রয়েছে অনেকেরই। আর সেজন্যই আশাবাদী মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে- শেষ পর্যন্ত পারবেন তো শেখ হাসিনা?

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।                                              সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন