ঢাকায় লাফিয়ে বাড়ল পানির দাম

0

প্রবাসীকণ্ঠ :রাজধানীতে বিশুদ্ধ পানির সংকট, শহরের প্রান্ত এলাকায় পানি সরবরাহে সমস্যার মধ্যে ঢাকা ওয়াসা চার মাসের মাথায় আবারও পানির দাম বাড়াল। আবাসিক ক্ষেত্রে দাম প্রতি ইউনিটে (এক হাজার লিটার) ১ টাকা ৫১ পয়সা এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ৩ টাকা ৭২ পয়সা বাড়ানো হয়েছে।
ওয়াসার পানির দাম বছরে সাধারণত ৫ শতাংশ হারে বাড়ে। কিন্তু এবার আবাসিক ও শিল্প-বাণিজ্যিক খাতে যথাক্রমে ১৭ ও ১৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সাধারণত বছরে একবার দাম বাড়ানোর কথা থাকলেও এবার দুই দফায় বাড়ানোর কারণে মোট দাম বাড়ল আবাসিকে ২২ শতাংশ এবং শিল্প ও বাণিজ্যিকে ১৮ শতাংশ।
গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে গ্রাহক, বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মতামত নিতে গণশুনানির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ওয়াসার পানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভোক্তাদের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পানির ক্ষেত্রেও এমন শুনানি জরুরি।
গত নভেম্বর মাসের বিলের সঙ্গে সর্বশেষ বাড়তি বিল পৌঁছেছে গ্রাহকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা গৌরাঙ্গ সাহা চার সদস্যের পরিবার নিয়ে আর কে মিশন রোডে থাকেন। বাড়তি বিল নিয়ে গত বৃহস্পতিবার ক্ষোভ জানিয়ে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, পানির দাম বাড়ানোর কারণে তাঁকে কমপক্ষে বাড়তি আরও দেড় শ টাকা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বাড়তি বিল সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে কিছুতেই সংগতিপূর্ণ নয়। এ কথা সত্য যে যতই বিল আসুক, বাড়িওয়ালাদের সমস্যা হবে না। বাড়তি বিলের সব বোঝা পড়বে ভাড়াটেদেরই কাঁধে।

হাটখোলার একজন ভাড়াটে বলেন, প্রতি মাসে গড়ে পানির বিল দেওয়া হয় ৮০০ টাকা। গত সপ্তাহে তিনি ভাড়ার স্লিপে পানির বিল লিখেছেন ৯৯০ টাকা।

অবশ্য ঢাকা ওয়াসা বলছে, পানির উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় দাম বাড়িয়েও সংস্থাকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। একই বছরে দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর পর এখন আবাসিক ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম ১০ টাকা; শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে তা ৩২ টাকা। গত বছরের জুলাইয়ে আবাসিক ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দাম ৮ টাকা ৯ পয়সা করা হয়েছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে একই হারে বাড়ানোর পর দাম হয় ৮ টাকা ৪৯ পয়সা। সর্বশেষ নভেম্বরে প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়িয়ে যোগ করা হয় ১ টাকা ৫১ পয়সা। শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে গত বছরের জুলাইয়ে দাম বাড়ানোর পর দাঁড়ায় ২৬ টাকা ৯৪ পয়সা। আর চলতি বছরের জুলাইয়ে ৫ শতাংশ বাড়ানোর ফলে দাম দাঁড়ায় ২৮ টাকা ২৮ পয়সা। সর্বশেষ দাম বাড়ানোয় হয়েছে ৩২ টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার একজন কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত ওয়াসা বোর্ড ৫ শতাংশ হারে পানির বিল বাড়াতে পারে। এবার বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত জুলাইয়ে ওই হারেই দাম বাড়ানো হয়। পরে ওয়াসারই আবেদনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ কমিটি বাড়তি হারে দাম নির্ধারণ করে। ওয়াসা সে অনুযায়ী নভেম্বর থেকে দাম বাড়িয়েছে।

হঠাৎ উচ্চ হারে দাম বাড়ানো সম্পর্কে ঢাকা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ঢাকা ওয়াসা পানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং চওড়া পাইপের সরবরাহ লাইন বসিয়েছে। এডিবির তাগিদ ছিল পানির দাম বাড়াতে হবে, যা হবে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পানির দাম বাড়ানোর ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকেরও তাগিদ ছিল।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, ওয়াসা আইন, ১৯৯৬-এ বলা আছে, পানির দাম উৎপাদন খরচের সমান বা বেশি হতে হবে। কিন্তু ঢাকা ওয়াসা কখনো উৎপাদন খরচের সমান পানির দাম নির্ধারণ করতে পারেনি। এক লাফে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানো হলে সাধারণ গ্রাহকদের সমস্যা কম হতো।

এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) এ কে এম শহীদউদ্দিন বলেন, দাতা সংস্থাগুলোর তাগিদ ছাড়াও বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় পানির দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়ানোর পরও উৎপাদন খরচের তুলনায় ওয়াসা এখনো লোকসানে রয়েছে। এক হাজার লিটার পানির উৎপাদন খরচ ১৩ টাকারও বেশি।

পানির বাড়তি বিল পেয়ে প্রথম আলোর কার্যালয়ে টেলিফোন করে ক্ষোভ জানান লালমাটিয়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গ্রাহক। তিনি বলেন, ‘চার মাসে দুবার পানির দাম এভাবে বাড়ানোর নজির আগে দেখিনি। সাধারণ মানুষের কথা ওয়াসা ভাবে না।’

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। পানির দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দাম বাড়ানোর পুরো দায়টা আসবে ভোক্তাদেরই ওপর। ঢাকা ওয়াসার অপচয়ের শেষ নেই। পানির পাইপের লিকেজের কারণে ভোক্তারা বিশুদ্ধ পানি থেকেও বঞ্চিত হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, ওয়াসার সিস্টেম লসের বিষয়েও অনেক কিছু শোনা যায়। এগুলো কমানো গেলে পানির দাম বাড়াতে হয় না। তিনি বলেন, পানির দাম বাড়ানোর জন্য ভোক্তাদের মতামতের মূল্য দেওয়া উচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর নজির আছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে যেমন শুনানির ব্যবস্থা থাকে, পানির ক্ষেত্রেও তা করা জরুরি। সূত্র প্রথম আলো