এরশাদের জাতীয় পার্টি এখন কার?

1

ভাঙন, রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা একাংশের


পর পর পাঁচবার ভেঙেছে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। তারপরও শেষ পর্যন্ত নিজেই দলের মূল অংশকে ধরে রাখতে পেরেছিলেন এরশাদ। তার মৃত্যুর পর ফের ভাঙনের মুখে দলটি। নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ভাঙ্গন এখন স্পষ্ট। পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলের নেতার পদ ঘিরে বিভক্ত নেতাকর্র্মীরা। জীবনের অন্তিম মুহুর্তে ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছিলেন এরশাদ। তখনই এ নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল দলে। পার্টি চেয়ারম্যানের এ সিদ্ধান্ত দলের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। তবে বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেনি কেউ। এরশাদের মৃত্যুর পর অনেকটা নাটকীয়ভাবেই পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের নাম ঘোষণা করা হয়। স্বামীর মৃত্যুতে পার্টির সিনিয়র কো চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ আড়ালে। প্রতিক্রিয়া আসে তার অনুসারি নেতাদের তরফে। বিষয়টি তারা মেনে নেবেন না এমনটি বোঝানোর চেষ্টা করেন। পার্টি চেয়ারম্যানের পদের পাশাপাশি আলোচনা ছিল জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতার পদটি নিয়ে। পার্টি প্রধানের সঙ্গে এরশাদ নিজেই এ পদে ছিলেন। সম্প্রতি পার্টির নেতাদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করে বিরোধী নেতার আসনে বসতে স্পিকার বরাবর চিঠি পাঠান জিএম কাদের। এ চিঠির পরই নড়েচড়ে বসেন রওশন এরশাদপন্থি নেতারা। মঙ্গলবার জিএম কাদেরের পক্ষে চিঠি দেয়ার পর দিন রওশন এরশাদের গুলশানের বাসায় বৈঠক করেন তার অনুসারী নেতারা। বিকালে কাদেরকে বিরোধী নেতা না করতে স্পিকার বরারব পাল্টা চিঠি পাঠান রওশন। জানানো হয় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে আসছেন রওশন। স্বামীর মৃত্যুর পর গতকালই প্রথম গণমাধ্যমের সামনে এলেন বিরোধী দলের উপনেতা। তাকে পাশে রেখে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি রওশন এরশাদকে পার্টির চেয়ারম্যান এবং মশিউর রহমান রাঙাকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে ছয় মাসের মধ্যে কাউন্সিল করার কথা জানান। এসময় পার্টির বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এ ঘোষণার ঘণ্টা খানেক পরে দলের বনানীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদের সংবাদ সম্মেলন করে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রওশন এরশাদকে তিনি মায়ের মতো সম্মান করেন। তিনি সেই সম্মান রাখবেন। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও রওশন নিজে চেয়ারম্যান হওয়ার ঘোষণা দেননি। কাদের দাবি করেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ি তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। যারা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।  এমন ঘোলাটে পরিস্থিতিতে দিকভ্রান্ত অবস্থায় আছেন নেতাকর্মীরা। এমন অবস্থায় এরশাদের শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনের নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে। এ আসনে কে দলের প্রার্থী হবেন প্রার্থী করতে এ নিয়ে চরম বিরোধ রয়েছে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টিতে। এরশাদপূত্র সাদকে এ আসনে পার্টির পক্ষ থেকে অবস্থান নিয়েছেন রওশন এরশাদপন্থি নেতারা। যদিও এর ঘোরতর বিরোধী স্থানীয় জাতীয় পার্টির একটি বড় অংশ। রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন পার্টির প্রার্থী হিসেবে তারা কোনভাবেই সাদকে মেনে নেবেন না। এমন অবস্থায় দল থেকে কাকে প্রার্থী দেয়া হবে এটি এখনও নিশ্চিত নয়। নেতাকর্মীরা বলছেন পার্টি চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদের একজনকে মনোনয়ন দিলে রওশনপন্থিরাও অন্য একজনকে প্রার্থী করতে পারেন। এতে এ আসনটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে জাপার। উদ্ভুত পরিস্থিতি সমাধানে আপাতত পার্টির হাতে কোন দাওয়াই দেখছেন না নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, একমাত্র সরকারের দৃশ্যমান বা অদৃশ্য হস্থক্ষেপ ছাড়া সমস্যার সমাধান মিলছে না। জাপার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার পক্ষের অদৃশ্য ইঙ্গিত পেয়েই রওশনপন্থিরা মাঠে নেমেছেন। আর এটি অনুমান করেই প্রেসিডিয়ামের কয়েকজন সদস্য রওশনের পক্ষে সরব হয়েছে। আগে তাদেরকে মাঝামাঝি থাকতে দেখা গেছে। পার্টি চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন অবস্থান শক্ত করতে পারলে বিরোধী দলের নেতার পদেও আসীন হতে পারেন উপনেতা রওশন। চলমান পরিস্থিতিতে দলের একটি বড় অংশ পর্যবেক্ষকের ভুমিকা নিয়েছেন। তারা সবকিছু দেখেই নিজেদের অবস্থান ঠিক করবেন। ক্রমে ক্ষয়ে যাওয়া জাতীয় পার্টি এখন ঘোরতর বিপদে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। পার্টি চেয়ারম্যান এবং বিরোধী নেতার ইস্যু আপাতত ভাগাভাগি হওয়ার মতো কোন পরিস্থিতি নেই। দুই পক্ষের নেতারাই চাইছেন দুই পদই তাদের দখলে রাখতে। এ অবস্থায় ইস্যু দুটি কোন উপায়ে নিষ্পত্তি করা হলেও এটি যে জাপাকে আরেকভার ভিক্তক্তি রেখায় টুকরো করে দেবে এ নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে দ্বিমত নেই। আর এটি হলে নতুন করে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে সাবেক শাসক এরশাদের হাতে গড়া দলটি। ১৯৮৫ সালের শেষ দিকে এরশাদ তার আগের গড়া জনদল, বিএনপির একাংশ, ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি এবং মুসলিম লীগের সমন্বয়ে গঠন করেন জাতীয় ফ্রন্ট। একপর্যায়ে কাজী জাফর স্বেচ্ছায় ইউপিপি ভেঙে দিয়ে এরশাদের দলে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালের ১লা জানুয়ারি সরকার নিয়ন্ত্রিত দল জাতীয় পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ক্ষমতার ছায়ায় গড়ে উঠা জাতীয় পার্টি প্রথম ভাঙনের মুখে পড়ে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের সময় জাতীয় পার্টি প্রথমে তাদের সমর্থন দিলেও পরে চারদলীয় জোটে চলে যায়। সে সময়ের যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরশাদের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ‘জাতীয় পার্টি’ নতুন দল গঠনের ঘোষণা দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে আরেক দফা ভাঙন ধরে। নাজিউর রহমান মঞ্জু জাতীয় পার্টি নামে আরেকটি দল গঠন করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এখন মঞ্জু পুত্র আন্দালিব রহমান পার্থ এ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পরে এ অংশটিতেও ভাঙন ধরে। মন্ত্রিত্ব নিয়ে ঝামেলার একপর্যায়ে এম এ মতিন আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেন। এক এগারোর সময়ও জাতীয় পার্টি দুটি অংশে বিভক্ত হয়েছিল, পরে অবশ্য এ দুটি অংশই এরশাদের নেতৃত্বে এক হয়ে যায়। সর্বশেষ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে। ২০১৩ সালের ২০শে ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে দলের বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন জাতীয় পার্টির ঘোষণা দেন কাজী জাফর আহমেদ। এ নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দল এবং একই সঙ্গে সরকারে অবস্থান নেয়। জাপা চেয়ারম্যান এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়। বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব পালন করেন রওশন এরশাদ। ওই নির্বাচনের আগেও দলে বিভক্তি স্পষ্ট ছিল। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে থাকায় পরে অবশ্য সেই বিভক্তি মিটে যায়। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগে টানাপড়েন দেখা দিলেও এরশাদের হস্থক্ষেপে পরিস্থিতি উতরে যায় জাপা। তবে এবার আগের বারের মতো বিরোধী আসনের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগ পায়নি জাতীয় পার্টি। এক তরফা সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসে। এরপর থেকেই আগের বার মন্ত্রী ছিলেন এমন নেতারা দলের নেতৃত্ব দিয়ে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেন। আগের বারের মন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙাকে দলের মহাসচিব করায় তার বিরোধী একটি পক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠে। তবে চেয়ারম্যান পদ দিয়ে নেতাকর্মীরা দুই ভাগে অবস্থান নিলেও মশিউর রহমান রাঙাকে দুই পক্ষই মহাসচিবের দায়িত্বে বহাল রেখেছেন। রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা: গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, রওশন এরশাদ পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ছয় মাসের মধ্যে কাউন্সিল করে গণতান্ত্রিক উপায়ে স্থায়ী চেয়ারম্যান ঠিক করব। এরশাদের ভাই জিএম কাদের জাতীয় পার্টির ‘গঠনতন্ত্র ভেঙে’ চেয়ারম্যান হয়েছেন অভিযোগ করে আনিসুল ইসলাম বলেন, জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের সম্মান দেবেন রওশন এরশাদ। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে রওশন এরশাদ বলেন, পার্টি এখন উদ্বিগ্ন আছে। পার্টিতে কী হচ্ছে? জাপা অতীতেও ভাগ হয়েছে, এবারও কি সেটি হচ্ছে নাকি? হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এত কষ্ট করে পার্টি গড়ে তুলেছেন, এখন সেই পার্টিটা ভালোভাবে চলুক, মান অভিমান ভুলে যারা চলে গেছে, তারা ফিরে আসুক। আমি চাই পার্টির সবাই মিলেমিশে জনগণের সেবা করব। রওশন এরশাদের সংবাদ সম্মেলনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু, মজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, এসএম ফয়সল চিশতী, মীর আবদুস সবুর আসুদ, খালেদ আখতার, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, ভাইস চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন খোকা ও নাসিম ওসমান উপস্থিত ছিলেন। শৃঙ্খলা নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: এদিকে সংবাদ সম্মেলন করে পার্টি চেয়ারম্যান ঘোষণার দিকে ইঙ্গিত করে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যারা পার্টির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, রওশন এরশাদ আমার মায়ের মত। তিনি নিজ মুখে তো আর বলেন নাই যে তিনি চেয়ারম্যান। তাকে সম্মান করি। আশা করি, তিনি এমন কিছু করবেন না, যাতে তার সম্মান নষ্ট হয়। দল ভাঙনের মুখে পড়েনি দাবি করে কাদের বলেন, যে কোনো লোক যে কোনো জায়গায় বলে দিল, তিনি রাজা। রাজার তো রাজত্ব থাকতে হবে, প্রজা থাকতে হবে। তিনি বলেন, প্রেসিডিয়ামের সদস্যদের অধিকাংশের সমর্থন নিয়েই তাকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে এবং দলীয় এমপিদের অধিকাংশের সমর্থন নিয়েই সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সালমা ইসলাম, এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, মোস্তাফিজার রহমান মোস্তাফা, রানা মোহাম্মদ সোহেল উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, অসুস্থ থাকা অবস্থায় এরশাদ গত এপ্রিলে ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন। গত ১৪ই জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার মৃত্যুর চার দিনের মাথায় এক সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়।