অস্ত্র পকেটে রাখার জন্য নয়

0

ঢাকা : ক্রসফায়ার নিয়ে সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্র পকেটে রেখে দেয়ার জন্য নয়, অপরাধীদের দমন করার জন্য। অপরাধীরা যখন মারা গেছে সেই অপরাধীদের জন্য কান্না! ক্রসফায়ারে মানুষ মারা হচ্ছে। ক্রসফায়ার তো না। কেউ যখন অপরাধ করতে যায়, পুলিশের তো রাইট আছে সেই মানুষের জানমাল বাঁচানো। আর সেটা বাঁচানোর জন্য তাদের যেটা করার তা তাদের করতে হবে। আমরা বাধ্য হয়েছি পুলিশকে সেই নির্দেশ দিতে। স্পষ্ট বলেছি- অস্ত্র পকেটে রেখে দেয়ার জন্য নয়, অপরাধীকে দমন করার জন্য। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত সিনিয়র সাংবাদিক, টকশো আলোচক ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সাজা কার্যকর করতে গিয়ে ‘বড় বড়’ জায়গা থেকে বাধা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা রায় কার্যকর করতে শুরু করেছি। আপনারা দেখেছেন যে, এ বিচারের রায় কার্যকর করতে গিয়ে কত উঁচু জায়গার টেলিফোন, ফাঁসি যেন দেয়া না হয় সেই অনুরোধ পর্যন্ত করা হয়েছে। মানবাধিকারের কথা বলব, কিন্তু মানবাধিকার যারা লঙ্ঘন করবে তাদের মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে নাকি! এখানে আমার একটা প্রশ্ন- যারা মারা গেল বা নির্যাতিত হলো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলো তাদের কথা চিন্তা না করে যারা ক্ষতি করছে, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, সেই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের মানবাধিকার নিয়ে সবাই যেন খুব বেশি সোচ্চার হয়ে পড়ে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গিয়ে ওই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো আমাদের। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের মানবাধিকার নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে নির্যাতিত, নিহতদের কথা না ভেবে তাদের যারা হত্যা, ধর্ষণ করেছে তাদের প্রতি ‘সহানুভূতি’ দেখানোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই একটা অদ্ভুত বিষয় আমি সব সময় দেখি যে, অপরাধীদের জন্য সবার মায়াকান্না। আর এই অপরাধীদের জন্য যারা জীবনটা দিলো তাদের জন্য অত দুঃখ নাই।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে ফাঁসি নিয়ে এত কথা হচ্ছে। ফাঁসি কি হচ্ছে না? ঈদের দিনে সাদ্দামকে ফাঁসি দিলো। যারা ফাঁসির বিরুদ্ধে এত কথা বলে, তারাইতো আবার সাদ্দামের ফাঁসি দেখে হাততালি দিয়ে খুশি হয়। সাদ্দাম যে অপরাধ করেছে, ওই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বা তাদের দোসর আল-বদর, রাজাকার, আল-শামস তারাও কি একই অপরাধ করেনি বাংলাদেশে? তার থেকে জঘন্য অপরাধই তো তারা করেছে। তাহলে তাদের অপরাধটা অপরাধ না কেন? এদেশের মানুষের কি জীবনের মূল্য নেই?
লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও লাদেনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই লাদেন বা সাদ্দাম বা গাদ্দাফি কাদের সৃষ্টি বা কারা সৃষ্টি করেছে, কারা মেরেছে, কারা আবার তাদের মেরে খুশি হচ্ছে। তারা অপরাধ করলে তাদের শাস্তি দেয়া যাবে, আর আমার দেশে একই ধরনের অপরাধ যারা করেছে তাদের যদি শাস্তি দেয়া হয় তাহলে সেটা কেন মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে?

মতিঝিল থেকে হেফাজতে ইসলামীর কর্মীদের সরিয়ে দেয়ার ঘটনা নিয়ে মিথ্যাচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রটনা করা হলো ২০০০ মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। যখন বারবার তালিকা চাওয়া হলো তারা তো ২০০ মানুষের তালিকা দিতে পারেনি। ৬১ জনের যে তালিকা দেয়া হলো সেখানেও অনেককে দেখা গেল যে, ‘আমি তো মরি নাই, আমি এখনো বেঁচে আছি’। এরাই মানবাধিকার সংরক্ষণ করার দায়িত্বে আছে।
মতবিনিময়ে অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, লেখক সেলিনা হোসেন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. মুনতাসীর মামুন, ড. আইনুন নিশাত, ড. খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান, ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম, সকালের খবর সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন, বিএফইউজে একাংশের সভাপতি মন্‌জুরুল আহসান বুলবুল, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, বাসস প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, একাত্তর টিভির সিইও মোজাম্মেল বাবু, ড. নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, ড. আনোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী, বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল, উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন, মামুন-অর-রশিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়
দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি মঙ্গলবার বর্ষবরণের দিনে গণভবনে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি সহিংসতামুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকারের কথা বলেন। তিনি বলেন, আগামীতে দেশে আর কোন সহিংসতা হবে না। শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মাহবুব-উল আলম হানিফ, খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ যাত্রা শুভ হোক, দেশবাসীর উন্নতি হোক। সকলের আশা-আকাঙক্ষা পূরণ হোক। এ সময় তিনি জ্বালাও পোড়াও সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন রাখেন, জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে কোন দল কিভাবে রাজনীতি করে সেটি বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, জানুয়ারির ৫ তারিখের পর প্রায় ৯২ দিন দেশের মানুষের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন চলেছিল তার অবসান হোক। অতীতে কোন দিন আমরা দেখিনি এভাবে আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়। আমি আশা করি এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আর বাংলাদেশে ঘটবে না।